বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮, ১১:২৮ পূর্বাহ্ন

শিশু ধর্ষণ- ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি

শিশু ধর্ষণ- ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি

মোঃ আশরাফুল মজিদ:: দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনা। গত ১০বছরে প্রতিদিন গড়ে ১১ জন নারী সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নারী ও শিশুর প্রতি নির্মম নির্মমতা ও ন্যক্কার জনক নির্যাতনে হতবাক বিবেকবান মানুষ।

সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে ছেলে শিশুরাও। পুলিশের ধারণা শিশুরা এক শ্রেণীর মানুষের যৌন বিকৃতির টার্গেটে পরিণত হয়েছে। শিশুদের ওপরে যৌন নিপীড়ন চালানোর একটা বড় কারণ বিকৃত মানসিকতা, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় পিডোফিলিয়া। মনোবিজ্ঞানে পিডোফিলিয়া মানসিক বিকৃতি বলেই স্বীকৃত।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১২ সালে ৮৬ জন, ২০১৩ সালে ১৭৯ জন, ২০১৪ সালে ১৯৯ জন, ২০১৫ সালে ৫২১ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ চিত্র থেকেই স্পষ্ট- প্রতি বছরই শিশু ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে। সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ৬৮৬ টি শিশু ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ইভটিজিং, যৌন হয়রানী সহ বিভিন্ন ধরনের যৌন নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ২০১৫ সালে সারাদেশে ৭২৭ টি শিশু যৌন নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছিল। তবে তাদের জরিপ অনুসারে ২০১৫ সাল থেকেই শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও নিপীড়ন আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৪তে সর্বমোট ২২৪ টি শিশু যৌন নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার  হয়েছিল। আগে মাদ্রাসা বা আবাসিক হোস্টেলে শিশু ধর্ষণের শিকার হত। এখন পথে ঘাটে দেদারসে ঘটছে ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনা। সমাজ তাত্ত্বিকরা ভাল বলতে পারবেন, একটা সমাজ কতখানি অসুস্থ হলে এরকম ঘটনা রোজ ঘটতে পারে। শিশুদের ওপর নির্যাতন বাড়া কিংবা শিশু ধর্ষণ বাড়ার কারণ হিসেবে অনেকই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা কে দায়ী করেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হচ্ছে, শিশুদের ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে।   পুলিশ সদরদপ্তরের গণমাধ্যম বিভাগের এ আই জি মোঃ নজরুল ইসলাম বলছেন, শিশুরা এখন এক শ্রেণীর লোকের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, এটা ঠিক শিশু ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। তারা শিশুদের নিয়ে পর্নোগ্রাফী তৈরি করছে। একশ্রেণীর মানুষ শিশুদের ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে পণোর্গ্রাফির প্রভাব রয়েছে। শিশুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। নানা শ্রেণীর এবং বয়সের ব্যক্তিরা এটি করছে। শিশুদের ওপর বল খাটানো বা প্রভাবিত করা, ভয় দেখানো সহজ হয়। ফলে সেই সুযোগ টি নিচ্ছে অপরাধীরা। গবেষকদের মতে, ক্রমবর্ধমান হারে শিশুদের যৌন লালসার শিকার বানানোর পিছনে রয়েছে কুসংস্কারও। বহুমানুষ ওই কুসংস্কারে বিশ্বাস করে থাকেন যে শিশু বা কুমারীদের সঙ্গে যৌন সংসর্গ করলে যৌন রোগ নিরাময় হয়ে যাবে। অন্তত দেড়শো বছর আগের ছাপা বটতলার বই নামে পরিচিত তথাকথিত বাংলা অশ্লীল সাহিত্যেও এই কুসংস্কারের উল্লেখ আছে যে কন্যাশিশু অথবা কুমারী নারীদের সঙ্গে যৌন সংসর্গ করলে নানা যৌন রোগ নিরাময় হয়।

সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ইমান আলী ও বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের এক রায়ে বলা হয়েছে, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে দেশের প্রতিটি থানায় আলাদা সেল গঠন করতে হবে। একমাস পরপর যৌন হয়রানির মামলার বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করবে থানা সেল। কিন্তু গত ১০ মাসেও আদালতের এ নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি।

ক্রমেই নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে চলছে। শিকার হচ্ছে কোমল মতি শিশুরাও। ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুম করার ঘটনাও ঘটছে। পরিচয় নিশ্চিহ্ন করতে নারীকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটছে। সুষ্ঠু বিচার পাচ্ছেনা ভুক্ত ভোগীরা। ফরেনসিক পরীক্ষার ঝামেলা, আলমত সংগ্রহ এবং অভিযুক্তকে পুলিশের কাছে উপস্থিত হতে বাধ্য করায় অনেকেই লোক লজ্জায় ঘটনা এড়িয়ে যেতে চায়।

থানায় মামলা হলেও গ্রেফতার হয়না অপরাধী। কেউ গ্রেফতার হলেও মামলা বেশিদূর এগোয়না। প্রভাবশালী বা ক্ষমতাসীনদের হুমকি, কখনও তাদের মধ্যস্থতায় মীমাংসা করতে বাধ্য হয় অভিযুক্তরা। ধর্ষণের মামলা চলাকালীন বিভিন্ন বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা আইনের আশ্রয় নিতে অনীহা তৈরি করে, বলছেন শিশু অধিকার কর্মীরা। ধর্ষণের মামলার ক্ষেত্রে এসব প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে কি ভাবছে রাষ্ট্র?

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বলা আছে, ১৮০দিনের মধ্যে মামলা প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। কিন্তু এমন অনেক নজির আছে যে বছরের পর বছর ধরে মামলা চলছে। বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন শিশু অধিকার কর্মীরা। তবে এ বিষয়ে অ্যটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বিচারক স্বল্পতা এখানে একটি সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন। এছাড়া মামলা ঝুলিয়ে রাখার ক্ষেত্রে ডিফেন্স ল ইয়ারের মানসিকতারও পরিবর্তন আনতে হবে।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিসংখ্যান বলছে, গত ৫ বছরে ৩ হাজার ৮৩১ টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২ হাজার ৩০৮ জন। ২০১২ সালে ধর্ষণের শিকার ৮০৫ জনের মধ্যে ৪৭৩ জন শিশু। ২০১৩ সালে ধর্ষণের শিকার ৮১৪ জনের মধ্যে ৪৫২ জন শিশু; ২০১৪ সালে ৬৬৬ জনের ৩৯৩ জন শিশু; ২০১৫ সালে ৭৮৯ জনের মধ্যে ৪৭৯ জন শিশু। ২০১৬ সালে ধর্ষণের শিকার ৭৫৭ জনের মধ্যে ৫১১জনই শিশু। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ৩৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪ এবং মার্চে ৫৫ জন।

নির্যাতিত নারী ও শিশুদের চিকিৎসায় গঠিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রায় প্রতি দিনই ধর্ষণের শিকার শিশু ওসিসিতে ভর্তি হয়েছে। বেশির ভাগ শিশুর বয়স ৬ থেকে ১৬ বছরে মধ্যে। সাম্প্রতিক সময়ে শিশু ধর্ষণে ঘটনা বেড়ে গেছে। ওসিসির সমন্বয়ক ডা. বিলকিস বেগম জানান, শিশুরাই ধর্ষণের সবচেয়ে বড় শিকার। কারণ তারা কিছুই বলতে পারে না, অসহায় থাকে ধর্ষণের সময়। ধর্ষককে ভয়ও পায়। শিশুরা কেবল ঘরের বাইরেই নয়, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নিজ ঘরে, নিকটাত্মীয়-স্বজনদের হাত থেকেও রক্ষা পাচ্ছেনা তারা। বেড়েই চলেছে শিশু ধর্ষণের ঘটনা। প্রতিদিন ই কোনও না কোনও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে ভর্তি হচ্ছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি)।গত কয়েক দিনে এই সংখ্যা আরও বেড়ে যাওয়ায় তাদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে ওসিসি।

নারী শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত২০০৩)  এর ধারা অনুযায়ী, ধর্ষণের অপরাধের যে সকল শাস্তির বিধান রয়েছে তা হলো, ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে ধর্ষণকারীর জন্য রয়েছে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড এবং ইহার অতিরিক্ত অন্যুন একলক্ষ টাকা অর্থদন্ডের বিধান। একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধ ভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে ধর্ষণকালে বা ধর্ষণের পর যদি তার মৃত্যু ঘটে তবে উক্ত দলের সকলের জন্যই এই শাস্তি প্রযোজ্য হবে।

বাংলাদেশে ধর্ষণ বাড়ছে, বাড়ছে ধর্ষণের পর হত্যা একই সঙ্গে বাড়ছে নিষ্ঠুরতা আর এই ধর্ষণের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় তেমন আনা যাচ্ছেনা বলা চলে৷ এর কারণ, অনেকেরই আছে ক্ষমতার যোগ, তাই তারা অপ্রতিরোধ্য,শিশু, অষ্টাদশী কিংবা পঞ্চাশোর্ধ, ‘ধর্ষণ’ নামক ব্যাধি থেকে আজ কোনো নারীই যেন নিরাপদ নয়। দিন দিন অপ্রিতিরোধ্য হচ্ছে এই জঘন্যতম কর্মটি। নারীদের কাছে আজকাল ‘বাঘ’ যতটা না ‘ভয়ঙ্কর’, তার চেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে ‘পুরুষ’ যা উদ্বেগের কারণ।

রাস্তা-ঘাট, হাট-মাঠ, বাস-ট্রেন, স্কুল-কলেজ, কর্মস্থল কিংবা আপন গৃহস্থল কোথায় নারী নিরাপদ? শিক্ষক, ডাক্তার, কর্মচারী, পুলিশ, আত্মীয়-স্বজন, চাচা-মামা-খালু, দুলাভাই কার কাছে নারী নিরাপদ? যখন নিজের কাছে নিজেই এই প্রশ্নগুলো করি, তখন লজ্জায় গুটিসুটি হয়ে যাই। প্রতিটি ধর্ষণ ঘটনায় পুরুষ হিসেবে আমিও লজ্জিত হই। শুধু আমি কেন? বিবেকবান প্রতিটি পুরুষই এসব ঘটনায় লজ্জায় কুকড়ে যাবেন।

 

 

মোঃ আশরাফুল মজিদ

ক্রিমিনলজি এন্ড পুলিশ সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট

৩য় বর্ষ ২য় সেমিস্টার।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন
শেয়ার করুন:





©সর্বস্বত্ব ২০১৬-২০২০ সংরক্ষিত