আজ ২১শে আগস্ট, ২০১৮ ইং; ৬ই ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ; শরৎকাল

ধর্ষনের শাস্তি হোক সর্বনিম্ন পুরুষাঙ্গ কর্তন সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড: হুমায়ুন আহমেদ সৃজন

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পাদকীয়ঃ পত্রিকার পাতা খুললেই, টিভির স্ক্রলে চোখ রাখলেই অথবা খবরের সন্ধানে অনলাইনে ঢুঁ মারলেই মেগা সিরিয়ালের ধারাবাহিক পর্বের মত একটি খবর প্রতিদিনই ভেসে উঠে চোখের সামনে। এটি কোন আনন্দ বা অর্জনের খবর নয়, এটি মানবতার ইতিহাসে নারীর প্রতি পুরুষের সবচাইতে ঘৃণ্য, কাপুরুষোচিত, বর্বর ও জঘন্যতম হিংস্র অপরাধ ধর্ষন।

প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা পৈশাচিক কায়দায় এক বা একাধিক ব্যক্তির দ্বারা ধর্ষিত/ গনধর্ষনের শিকার হচ্ছে বিভিন্ন বয়সের যুবতী মেয়েরা। শুধু যুবতী বা বিবাহিত মহিলারাই নয়, ধর্ষনের শিকার হচ্ছে ১ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৫৫ বছরের বৃদ্ধা, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থেকে শুরু করে রাস্তার পাগলী পর্যন্ত। এমনকি ধর্ষন/ গনধর্ষনের পর নৃশংসভাবে পৈশাচিক কায়দায় হত্যাকান্ডের ঘটনাও অহরহ।

বাড়ির পাশের সবজী ক্ষেতে, নির্জন রাস্তার ধারে, রাস্তায় চলন্ত গাড়িতে/লঞ্চে/ ট্রেনে, বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, অফিস বা অন্যান্য কর্মস্থলে, বন্ধু বান্ধবের বাসায় পার্টিতে এমনকি নিজ বাড়িতেও ধর্ষনের শিকার হচ্ছে মেয়েরা।

কোন সম্পর্কই ধর্ষনের মত অপরাধের হাত থেকে বাঁচাতে পারছেনা নারীদের। ঘরে বাইরে মেয়েরা আজ কোথাও কারো সাথে নিরাপদ নয়। ভাইয়ের হাতে বোন, বাবার হাতে মেয়ে, চাচার হাতে ভাতিজি এমনকি দাদার হাতে নাতনী পর্যন্ত ধর্ষিত হচ্ছে অহরহ।

শুধু ধর্ষন করেই ক্ষান্ত হচ্ছেনা এই অমানুষগুলি, কাপুরুষের দল ধর্ষনের পর নানা পৈশাচিক কায়দায় নৃশংসভাবে হত্যা করছে নারীদের এমনকি ধর্ষনের পর সেটা ভিডিও করে ধর্ষিতা ও তার পরিবারকে ব্ল্যাক-মেইল করার মত ঘটনাও ঘটছে প্রায়শই।

বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছরে ইভটিজিং, শ্লীলতাহানি ও ধর্ষন এতোটাই বেড়ে গেছে যে তা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। এমন কোন গনমাধ্যম নেই যেখানে প্রতিদিন, প্রতিমুহুর্তে নতুন করে কোন ধর্ষনের সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে না।

আজ আমরা এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছি, উন্নয়নের কথা বলছি, আমরা উন্নত ও সভ্য জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচিত করতে চাইছি অথচ এই উন্নয়ন বা এগিয়ে যাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের নৈতিকতার অবক্ষয় হচ্ছে, নারীদের প্রতি সহনশীলতার পরিবর্তে নুন্যতম মানবিকতার ছিটেফোঁটাও আমরা হারিয়ে ফেলছি প্রতিমুহুর্তে, শুধুমাত্র কয়েক মিনিটের বিকৃত কামোত্তেজনা মেটাতে গিয়ে ধর্ষনের মত ঘৃণ্য অপরাধের জন্ম দিচ্ছে এই সমাজে পুরুষের বেশধারী কিছু কাপুরুষ, জানোয়ার ও অমানুষেরা। এরপর সেই ঘটনা ধামাচাপা দিতে গিয়ে হত্যা করা হচ্ছে অসহায় ধর্ষিতা নারীকে কিংবা পরবর্তীতে ধর্ষনের ঘটনা ফাঁস করে দেবার ভয় দেখিয়ে দিনের পর দিন ধর্ষন করা হচ্ছে নির্যাতিতা মেয়েটিকে।

বন্ধুর বাসায় কিংবা আবাসিক হোটেলের বিছানায় প্রেমের নাম করে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বোকা মেয়েটার সাথে দিনের পর দিন শারীরিক সম্পর্ক লিপ্ত হচ্ছে প্রেমিক নামধারী এক শ্রেণির কুলাঙ্গার। আর সেই সম্পর্কের ফলে মেয়েটি যখন গর্ভবতী হয়ে সেই প্রেমিককে বিয়ের জন্য চাপ দেবে ভাবছে তখনই প্রেমিক নামধারী কুলাঙ্গারটি ছদ্মবেশ থেকে বের হয়ে এসে মেয়েটিকে এবোরশন করাতে বাধ্য করছে। শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত থাকা অবস্থায় অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ছবি ও ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে পুনরায় দিনের পর দিন ধর্ষন করে যাচ্ছে মেয়েটিকে।

একদিকে বিবাহিত পুরুষের একটা বিশাল অংশ পর নারীতে আসক্ত হয়ে পড়ছে অপরদিকে বিবাহিত গৃহবধূদের একাংশ পরবর্তীতে অবিবাহিত কমবয়সী ছেলেদের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। পরকীয়ায় ছোবলে শুধু ধর্ষনের মত ঘটনাই ঘটছেনা, পরকীয়ার জেরে  অহরহ খুন খারাবির ঘটনাও ঘটছে।

নিজগৃহে বাবার হাতে তারই ঔরসজাত ছোট্ট মেয়েটি, মামা/ চাচার হাতে ছোট্ট ভাতিজি, বড় ভাইয়ের হাতে আদরের ছোট্ট বোন এমনকি দাদা/নানার হাতে নাতনী পর্যন্ত ধর্ষিত হবার খবর গণমাধ্যমের প্রতিদিনের খবরে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পিতৃতুল্য শিক্ষকের হাতে কোমলমতি ছাত্রী ধর্ষিত হচ্ছে। বাবা/মামা/চাচা/ভাই/শিক্ষকের হাতে ধর্ষিতা মেয়েগুলি বিচার চাইবে কোথায় আর কার কাছে এটা বুঝতে না পেরে বা লোকলজ্জায় মেয়েগুলিও দিনের পর দিন নিরবে ধর্ষিতা হয়ে চলেছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত ধর্ষনের খবর দেখে আমরা শংকিত হচ্ছি, আমরা শিউরে উঠছি, আমরা ঘৃণায় লজ্জায় মুখ লুকাচ্ছি, কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এইসব ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছি, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী করছি। কিন্তু দিনশেষে এইসব ধর্ষনের বিচার কতখানি পাচ্ছে ধর্ষিতা বা তার পরিবার?

বিচার চাইতে গিয়ে পুনরায় ধর্ষিত হতে হচ্ছে, বিচারের নাম করে ধর্ষিতাকে একঘরে করে রাখা হচ্ছে, বিচার চাওয়ার অপরাধে মা-মেয়েকে একসাথে গনধর্ষন করে চুল কামিয়ে দেয়া হচ্ছে এমনকি বিচার চাওয়ার পর ধর্ষনের শিকার অসহায় মেয়েটাকে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েও তাকে পুনরায় ধর্ষিত হয়ে খুন হবার হাত থেকে বাঁচাতে পারছেনা অসহায় বাবা।

ক্ষেত্র বিশেষে ধর্ষনের শিকার হওয়া মেয়েটিকেই দায়ী করা হচ্ছে, তার সাজ পোষাক নিয়ে প্রশ্ন তুলা হচ্ছে।

পারিবারিক/ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, নাটক-সিনেমা-গান-বিজ্ঞাপনে মেয়েদের পণ্য হিসেবে প্রচার করা, অপ- সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বেড়ে যাওয়া, মাদকের বিষাক্ত ছোবল এবং অতিরিক্ত আধুনিকতা ও যৌনতাকে উসকে দেয়া চালচলন ইত্যাদির কারনে সমাজে ইভটিজিং, শ্লীলতাহানী ও ধর্ষনের মত ঘৃণ্য অপরাধগুলি বেড়েই চলেছে।

আমাদের এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, যেকোন কিছুর বিনিময়ে এই পরিস্থিতিকে বদলাতেই হবে না হলে পরে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের অপরাধী হয়ে থাকা ছাড়া আর কোন রাস্তাই থাকবেনা, পরবর্তী প্রজন্মকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকেও কোনভাবে বাঁচানো যাবেনা।

 

কয়েক মিনিটের নিষিদ্ধ কামোত্তেজনা নিয়ন্ত্রন করতে না পেরে যে সমস্ত কাপুরুষেরা ধর্ষনের মত অপরাধ করবে তাদেরকে সর্বনিম্ন পুরুষাঙ্গ কর্তন ও সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে আইন পাশ করতে হবে। ধর্ষনের শিকার প্রতিটি মেয়ের পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করে ধর্ষকদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে প্রকাশ্য দিবালোকে ফায়ারিং স্কোয়াডে ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করতে সাহস না পায়।

মনে রাখতে হবে ধর্ষক যেই হোক সে কারো আপনজন হতে পারেনা, ধর্ষকের জন্য কোন মানবাধিকার থাকতে পারেনা। আমাদের মনে রাখতে হবে নারী শুধু ভোগের বস্তু নয়, নারী একজন মা, বোন, মেয়ে। সমাজে আমাদের পুরুষদের যেটুকু অধিকার প্রত্যেকটি নারীর ক্ষেত্রেও পুরুষের সমাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পারিবারিকভাবে নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিপরীত লিঙ্গ সম্পর্কে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সঠিক ধারণা পৌঁছে দিতে হবে, ধর্মীয় শিক্ষার পরিমান বাড়াতে হবে, মাদকের ভয়ানক বিষাক্ত ছোবল থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে হবে, নাটক-গান-সিনেমা-বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্য হিসেবে প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে এবং আমাদের সমাজ সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক সব ধরনের অপ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন পুরোপুরিভাবে বন্ধ করতে হবে।

এখন আর চুপ করে থাকার সময় নেই, ধর্ষনের মত অপরাধ বন্ধে সকলের স্ব স্ব অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করতে হবে, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, ধর্ষনের বিরুদ্ধে পারিবারিক/ ধর্মীয়/ সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে ধর্ষক আমার শত্রু, আমার মা-বোন-মেয়ের শত্রু, পরিবারের শত্রু, সমাজের শত্রু, দেশের শত্রু এবং মানবতার শত্রু সুতরাং মানবাধিকার ধর্ষকের জন্য নয় বরং ধর্ষনের শাস্তি হোক সর্বনিম্ন পুরুষাঙ্গ কর্তন সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড!

লেখকঃ সংবাদকর্মী, অনলাইন ও সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট।

 

ই-মেইলঃ nirobota4humayun@gmail.com

প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন