আজ ২৩শে জুন, ২০১৮ ইং; ৯ই আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ; বর্ষাকাল

দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নতুন গন্তব্য ময়মনসিংহ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পর্যটকদের কাছে ক্রমেই পরিচিত ও প্রিয় হচ্ছে ময়মনসিংহ। বিদেশিদের আসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যটন পরিকাঠামো উন্নত করছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, জেলা ও পৌরসভা প্রশাসন। পরিসংখ্যান বলছে, চার-পাঁচ বছর ধরে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে এই ঐতিহ্য ভরা জেলায়। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের পার্কগুলোতেও ভিড় করছে ভ্রমণপিপাসুরা।

ময়মনসিংহ জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অনেক দর্শনীয় স্থাপনা ও স্থান। শহরে রয়েছে জমিদারদের প্রতিষ্ঠিত ‘শশীলজ’। এখানে আছে গ্রিক দেবী ভেনাসের অসাধারণ ভাস্কর্য, চারপাশে  ফুলের বাগান। মহারাজা শশীকান্তের স্মৃতিবিজড়িত দর্শনীয় স্থানটিতেও এসেছেন অনেকে।

এই জেলায় কেউ দেখতে আসেন আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল, কেউ দেখতে গেছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা। এ ছাড়া আছে শিশুপার্ক, প্যারাডাইস পার্ক, জাদুঘর, ১২০০  একরের বেশি বড় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, আনন্দমোহন কলেজ, ত্রিশাল নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়,  মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ, টাউন হল সংলগ্ন সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্কয়ার।

আবার অনেকেই ছুটে যান গফরগাঁওয়ে ভাষাসৈনিক আব্দুল জব্বারের জাদুঘরে। স্থানীয়রা যান আলতাফ গোলন্দাজ সেতু, মুক্তাগাছায় ষোল হিস্যার জমিদারবাড়ি, রসুলপুর বন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্পের শিশুপার্ক।

বিদেশিদের মধ্যে বেশি আকর্ষণ ধোবাউড়ার চীনামাটির টিলা ও গৌরীপুরের রাজবাড়ি, রামগোপালপুর জমিদারবাড়ি, বীরাঙ্গনা সখীনার মাজার ও নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার মাজার, ফুলবাড়িয়ায় আলাদিন পার্ক, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত আঠার বাড়ি জমিদারবাড়ির দিকে।

ঈদ, পূজা, পালা-পার্বনে পর্যটকদের ঠাসাঠাসি ভিড় পড়ে। পর্যটক আর তাদের গাড়ির ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় পুলিশের।

ময়মনসিংহের পুরনো বাড়ি, ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা দেখতে আর প্রকৃতির আকর্ষণে বারবার পর্যটকরা ছুটে আসেন এখানে। তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সজাগ প্রশাসন। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, পর্যটকরা এখানে নির্ভয়ে ঘোরাঘুরি করেন।

সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে মুক্তাগাছা জমিদারবাড়ি সংস্কার হওয়ায় সেখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিষ্ণু সাগর দীঘি, প্রাচীন স্থাপনা যুগল মন্দির, চান খাঁর মসজিদ, বিবির ঘর, ঘূর্ণায়মান নাট্যমঞ্চ, সাত ঘাটের পুকুর, জলটং, শিশুপার্ক, রসুলপুর বন ঘুরে দেখে মুক্তাগাছার ঐতিহ্যবাহী খাবার মণ্ডার স্বাদ নিয়ে ফিরে যান পর্যটকরা।

মুক্তাগাছার মণ্ডা নিয়ে আছে কিংবদন্তি। ২০০ বছর আগে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে গোপাল পাল নামের একজন  এই মণ্ডা তৈরি করেন বলে কথিত আছে। মণ্ডা বিক্রেতা গোপাল পালের বংশধররা জানান, এ বছর পর্যটকের সংখ্যা বেশি, তাই মণ্ডা বিক্রি বেড়েছে। জমিদারবাড়ি সংস্কারের ফলে পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

সতের শতকের মাঝামাঝি নির্মিত মুক্তাগাছার জমিদারবাড়ি আঠারো শতকের ভূমিকম্পে ভেঙে  পড়ে। পরবর্তী সময়ে লন্ডন ও ভারত থেকে সুদক্ষ কারিগর এনে ভূমিকম্প সহিষ্ণু করে পুনর্নির্মাণ করা হয় সেটি।

১৯৪৭ সালের পর মুক্তাগাছায় জমিদারি প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরীর ১৬ জন বংশধরের প্রায় সবাই চলে যান ভারতে। পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে তাদের নির্মিত ১৬টি বাড়ি। ক্রমান্বয়ে বাড়িগুলোতে (রাজবাড়ি ছাড়া) গড়ে তোলা হয় শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, নবারুণ বিদ্যানিকেতনসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। জমিদারদের কয়েকটি বাড়ি এখনো দখল করে অবৈধভাবে বসবাস করছেন স্থানীয় কিছু লোকজন।

বর্তমান সরকার পর্যটনের অপার সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে জমিদারবাড়ি সংস্কারের কার্যক্রম হাতে নেয়। সংস্কারের ফলে ফিরে আসতে থাকে বাড়িটির আগের চেহারা। গত জুনে সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আরো সময় প্রয়োজন বলে জানান সংশ্লিষ্ট  শ্রমিকরা। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সংস্কারকাজের সময় বৃদ্ধি করে চালিয়ে যাচ্ছেন কাজ।

কথিত আছে, একসময় নিম্নাঞ্চল ছিল মুক্তাগাছা শহর। বিশাল দীঘি খনন করে শহর উঁচু করে জমিদারির গোড়াপত্তন করা হয়। এরপর দীর্ঘ আড়াই শ বছর ধরে বন্যামুক্ত মুক্তাগাছা। মুক্তাগাছায় এখানে অবস্থানকালে বহু স্থাপনা নির্মাণ করেন। রোপণ করেন দুর্লভ প্রজাতির গাছপালা।

এখন জমিদার না থাকলেও রয়ে গেছে তাদের নির্মিত বহু মূল্যবান স্থাপনা। সম্প্রতি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্পের অভ্যন্তরে স্থাপন করা হয়েছে শিশুপার্ক।

ময়মনসিংহ- টাঙ্গাইল সড়কের মুক্তাগাছার রসুলপুর বনে শাল-গজারি গাছ আর লাল মাটিতে আনারস বাগান দেখলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। শোনা যায়, জমিদারদের অত্যাচার থেকে পরিত্রাণ পেতে এই বনে একসময় গড়ে ওঠে বিদ্রোহী ফকির সন্ন্যাসী বাহিনী।

প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন