বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৪:৫৩ পূর্বাহ্ন

রমজানে কোরআন তেলাওয়াতের গুরুত্ব

রমজানে কোরআন তেলাওয়াতের গুরুত্ব

‘রমজান মাসই হল সে মাস; যে মাসে কোরআনুল কারিম নাজিল করা হয়েছে। (উদ্দেশ্য এ কুরআন) মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি (রমজান) পাবে, সে এ মাসের রোজা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা (রোজা) পূরণ করবে।

আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না যাতে তোমরা গণনা পূরণ কর। আর তোমাদের হেদায়েত দান করার কারণে তোমরা আল্লাহ তাআলার মহত্ত্ব বর্ণনা কর। যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৫) উল্লেখিত আয়াতে কারিমা থেকে বুঝা যায়, রমজান মাস; কোরআন নাজিলের মাস।

সুতরাং বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করা এবং এর অধ্যয়ন করা এ মাসের অন্যতম ইবাদত। প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন, ‘যে ব্যক্তি পবিত্র কোরআনের একটি অক্ষর পড়বে, সে একটি নেকি পাবে। আর একটি নেকি দশটি নেকির সমপরিমাণ।’ (তিরমিজি) কোরআন তেলাওয়াতের স্পৃহা: উম্মাতে মুহাম্মাদি রমজান মাস জুড়ে কোরআন তেলাওয়াতের স্পৃহা পায় এ বর্ণনা থেকে যে, ‘প্রত্যেক রমজানে হজরত জিবরিল আলাইহিস সালাম প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পূর্ণ কোরআন শোনাতেন এবং প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও হজরত জিবরিল আলাইহি সালামকে পূর্ণ কোরআনুল কারিম শোনাতেন। প্রিয়নবি এ ধারা বাস্তবায়নেই বর্তমান সময়ে রমজান মাসে খতম তারাবির প্রচলন চালু আছে। আর প্রত্যেক মুসলমানে উচিত রমজান মাসে পূর্ণ কোরআনুল কারিমের তেলাওয়াত সম্পন্ন করা।

কোরআনুল কারিমের হক:

রমজান মাসে কোরআনুল কারিমে হক হলো, তাড়াহুড়ো না করে ধীরস্থির ভাবে তারতীলের সঙ্গে পূর্ণ কুরআন তেলাওয়াত করার পাশাপাশি কুরআনের ভাব-ভাষা ভঙ্গি মর্মার্থ অনুধাবন করা। কুরআনুল কারিমের মর্মার্থ উপলব্ধি করে তা থেকে হেদায়েত কল্যাণ রহমত বরকত গ্রহণ করা। ইমাম জুহরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি রমজান মাসের আগমনে বলতেন, ‘এ মাস হলো কোরআন তেলাওয়াত ও খাদ্যদানের মাস।’ হজরত সুফিয়ান সাওরি রহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজে রমজান মাসে অন্যান্য সব নফল ইবাদতের চেয়ে কোরআন তেলাওয়াতে বেশি মশগুল থাকতেন। হাদিসে এসেছে- কোরআন তেলাওয়াতকারী ব্যক্তির জন্য কোরআন সুপারিশকারী হবে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘রোজা এবং কোরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে আমার রব! আমি তাকে দিনের বেলা পানাহার এবং স্ত্রী-সহবাস থেকে বিরত রেখেছি। তাঁর সম্পর্কে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কোরআন বলবে, হে আমার রব! আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। তাঁর সম্পর্কে আমার সুপারিশ কবুল করুন। তখন আল্লাহ তাআলা রোজা এবং কোরআনের সুপারিশ গ্রহণ করবেন।’

মনীষীদের কোরআন তেলাওয়াত:

রমজান এলে পূর্বেকার মনীষীরা কোরআনময় হয়ে যেতেন! কোরআনের সাথে গড়ে তুলতেন গভীর সখ্য। কোরআনই হয়ে যেতো তাদের জীবনসঙ্গী, সফরসঙ্গী তথা নিত্যসঙ্গী।

পবিত্র কোরআনের প্রতি তাদের ভালবাসা ছিল অমলিন ঈর্ষণীয় ও সীমাহীন। ইমাম আবু হানিফা (র.) এর কথা প্রসিদ্ধ আছে, তিনি রমজান মাসে ৬১ খতম তিলাওয়াত করতেন। ইমাম আবু বকর ইবনে আইয়্যাশ (র.) ত্রিশ বছর যাবৎ প্রতিদিন একবার কোরআন খতম করতেন। এ সম্পর্কে ইমাম নববী (র.) বলেন ‘হযরত ইব্রাহীম ইবনে আবু বকর আয়্যাশ (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার পিতা আমাকে বললেন, নিশ্চয় তোমার পিতা কখনও ফাহিশা (গর্হিত, যিনা-ব্যভিচার) কাজ করেনি। আর সে ত্রিশ বছর যাবৎ প্রতি দিন এক খতম কোরআন তেলাওয়াত করেছে।

ইমাম আবু বকর আইয়্যাশ থেকে আরও বর্ণিত আছে, তিনি তার ছেলেকে বলেন, বৎস! এই ঘরে আল্লাহর নাফরমানি থেকে অবশ্যই বেঁচে থাকবে। আমি এই ঘরে ১২ হাজার বার কোরআন খতম করেছি। তার থেকে আরও বর্ণিত, মৃত্যুর সময়ে তার মেয়ে কাঁদছিলো। তিনি মেয়েকে বললেন, কেঁদো না। তুমি কি ভয় করছো, আল্লাহ আমাকে শাস্তি দিবেন; অথচ আমি ঘরের এই কোণে চব্বিশ হাজার খতম দিয়েছি? (শারহে মুসলিম নববী : ১/৭৯) ইমাম ইবনে কাসীর (র.) ইমাম বোখারী রহ. এর আমল সম্পর্কে লিখেছেন ‘তিনি প্রত্যেক রাতে তেরো রাকাত নামায আদায় করতেন।

আর রমজান মাসে প্রত্যেক রাতে এক খতম কোরআন তেলাওয়াত করতেন।’(আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ১১/৩১)। হজরত আসওয়াত ইবনে ইয়াজিদ (র.) রমজানের প্রতি দু’রাতে কোরআন খতম করতেন। তিনি মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে নিদ্রা যেতেন। রমজান ব্যতীত অন্য সময়ে ছয় রাতে তিনি কোরআন খতম করতেন। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা : ৪/৫১)।

প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন
শেয়ার করুন:





©সর্বস্বত্ব ২০১৬-২০২০ সংরক্ষিত