আজ ২১শে আগস্ট, ২০১৮ ইং; ৬ই ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ; শরৎকাল

তাকওয়া অর্জনের মাস রমজান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

224729_195আবার এলো রমজান, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য তাকওয়ায় শাণ দেয়া। যেই তাকওয়া মানবতার সব রকমের কল্যাণ ও মর্যাদার প্রতীক। তাকওয়ার ওপর ভিত্তি করেই নিরূপিত হয় মানুষের মর্যাদা বা শ্রেষ্টত্ব। দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ তাকওয়ার ওপর নির্ভরশীল। সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের জন্য তাকওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তাকওয়াহীন ব্যক্তি সে যেই হোক না কেন, তাকে সম্মানি ব্যক্তি বলা যাবে না। যদিও পৃথিবীর মানুষ বংশ, বর্ণ, ভাষা, দেশ এবং জাতীয়তার ভিত্তিতে মর্যাদার বৃত্ত গড়ে তুলেছে, কিন্তু তাকওয়ার কাছে তা একান্তই মূল্যহীন।
বংশ, ভাষা, বর্ণ ও দেশ এগুলো আল্লাহরই সৃষ্টি, তাই বলে এগুলো কোনো মর্যাদার মানদণ্ড বা মাপকাঠি নয়। বরং এগুলো আল্লাহ দিয়েছেন যাতে মানুষ পরস্পরকে চিনতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘হে মানব জাতি, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে দিয়েছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি অধিক সম্মানিত, তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে (মোত্তাকি)। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সবকিছু জানেন ও খবর রাখেন’ (আল হুজরাত ১৩)।
পৃথিবীর অন্যন্য জাতি-গোষ্ঠীর মতো মুসলমানরাও যেদিন থেকে তাকওয়াকে বাদ দিয়ে অন্যান্য বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে মানুষের মর্যাদা দিতে শুরু করেছে, সেদিন থেকে তাদের কপালও পুড়তে শুরু করেছে। রাসূল সা:-এর অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়া ‘বুনিয়ানুম মারচুচ’ ‘সুদৃঢ় প্রাচীর’ এর ফাটল বা ভাঙনও সেখান থেকেই শুরু হয়। বিজাতীয়দের মতো মুসলমানদের মধ্যেও আজ খান্দান, গোত্র ও গোষ্ঠীগত বিভেদের পাহাড় পরিলক্ষিত হয়। আর এরই ফলে তাদের মধ্যেও অহঙ্কার, ঘৃণা, তাচ্ছিল্য, বিদ্বেষ ও অবমাননা এবং জুলুম ও নির্যাতন দানা বেঁধে ওঠেছে। অথচ এটি ছিল ইহুদি-খ্রিষ্টান ও পৌত্তলিকদের চরিত্র। জাতীয়তার ভিত্তিতে ইহুদিরা মনে করেছে, তারাই আল্লাহর মনোনীত সৃষ্টি। এজন্য পৃথিবীর সকল অইসরাইলিরা অধিকার ও মর্যাদার দিক থেকে নিম্ন পর্যায়ের। পক্ষান্তরে খ্রিষ্টানেরা বলেছে ঈশা আল্লাহর পুত্র (নাউজুবিল্লাহ), সুতরাং তারাই পৃথিবীর শ্রেষ্ট জাতি। হিন্দু জাতি পৃথিবীর অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠী থেকে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠতর মনে করা ছাড়াও নিজেদের মধ্যেও অসংখ্য কঠিন ভেদনীতি চালু করে রেখেছে। তারা বর্ণাশ্রমের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এবং শুদ্রদের লাঞ্ছনার গভীর খাদে নিক্ষেপ করেছে। তাদের ঘরে অন্য ধর্মের কেউ ঢুুকে গেলে সেটিকে ধুয়ে-মুছে পবিত্র করে থাকে। এরাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদার গণতন্ত্র ও কট্টর সমাজনীতি শ্রেণিসংগ্রামের আগুন জ্বালিয়েছে, সাদা-কালো বর্ণবাদনীতি অসংখ্য বনী আদমের রক্ত ঝরিয়েছে, আদিবাসী-অআদিবাসীর উচ্ছেদের সংগ্রাম তো চলছেই।
আমাদের ভালো করে মনে রাখা প্রয়োজন- খান্দান, বংশ, গোত্র ও গোষ্ঠী, বর্ণ, ভাষা, দেশ ও জাতীয়তা এগুলো অহঙ্কারেরও হোতা। আরো মনে রাখা প্রয়োজন, পৃথিবীর সর্বপ্রথম যে গুনাহের খাতায় নাম লিখিয়েছিল সে হলো শয়তান এবং প্রথম যে গুনাহটি আল্লাহর হুকুমকে মানতে অবাধ্য করেছিল সেটি হলো অহঙ্কার। আর অহঙ্কার সৃষ্টি হয়েছিল জন্মগত শ্রেষ্টত্বকে ভর করে। সূরা বাকারায় আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘আমি ফেরেস্তাদের বলেছিলাম : আদমকে সেজদা কর। সবাই সেজদা করল, কেবল ইবলিশ করল না। সে অস্বীকার ও অহঙ্কার করল। সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।’ অন্যত্র বলা হয়েছে- সে বলল, আমি আগুনের তৈরি আর আদম মাটির তৈরি। অর্থাৎ তার মধ্যে বর্ণবাদের অহঙ্কার ও বিদ্বেষ দানা বেঁধে উঠেছিল। ফলে সে-ই পৃথিবীর প্রথম নিকৃষ্ট কীট, যে আল্লাহর আদেশকে অমান্য করল এবং তাঁর লানত নিয়ে কেয়ামত পর্যন্ত তাকে বেঁচে থাকতে হবে।
কিন্তু ইসলাম এসব নীতিকে কখনোই সমর্থন করে না। মানুষের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের বুনিয়াদ হলো তাকওয়া। জন্মগতভাবে সব মানুষ সমান। কেননা তাদের মূল উৎস এক। একমাত্র পুরুষ এবং একমাত্র নারী থেকে গোটা জাতি অস্তিত্ব লাভ করেছে। তাদের সবার সৃষ্টিকর্তা এক, তাদের সৃষ্টির উপাদান ও নিয়ম-পদ্ধতি এক এবং তাদের সবার বংশধারা একই পিতা-মাতা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। সুতরাং মানুষ যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক না কেন, সেটি দেখার বিষয় নয়। বরং যে মূল জিনিসের ভিত্তিতে এক জন অপর জনের ওপর মর্যাদা লাভ করতে পারে তা হচ্ছে এই যে, সে অন্য সবার তুলনায় অধিক আল্লাহ ভীরু, মন্দ ও অকল্যাণ থেকে দূরে অবস্থানকারী এবং নেকি ও পবিত্রতার পথ অনুগমনকারী।
ইসলাম সাম্য-সংহতির অনুপম শিক্ষা শুধু ব্যক্তি চরিত্রে নয়, বরং মানুষের পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় জীবনসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাস্তবায়ন করেছে। আজ থেকে চৌদ্দ শ’ বছর আগে রাসূল সা: কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদীনা নামক ইসলামি রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করুন। রাসূল সা: এমন এক সমাজ কায়েম করেছিলেন, যেখানে বর্ণ, বংশ, ভাষা, দেশ ও জাতীয়তার কোনো ভেদাভেদ ছিল না, যেখানে উঁচু-নিচু, ছুত-ছাত এবং বিভেদ ও পক্ষপাতিত্বের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। সে সমাজব্যবস্থায় হজরত বেলাল রা: এবং হজরত ওমর রা: এর মধ্যে যেমন কোনো পার্থক্য ছিল না, তেমনি আলী রা: ও আনাস-জায়েদ ইবনে সাবেত রা: মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না। থাকলেও সেটি তাকওয়ার ভিত্তিতেই নিরূপণ হতো।
প্রকৃতপক্ষে আমরা মুত্তাকি হতে পারছি না বিধায় ইহুদি-খ্রিষ্টানদের মতো বিকল্প পথে মর্যাদার সন্ধান করে ফিরছি। আর এ জন্য আমরাও বংশ, বর্ণ, ভাষা, দেশ এবং জাতীয়তার ভিত্তিতে মর্যাদার বৃত্ত গড়ে তুলেছি। এ নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যেই আমাদের সামজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। এ নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে আমাদের চিন্তা-চেতনাকে নিয়ে যেতে পারছি না বিধায় উন্নয়নের বাধাগুলোও টপকানো আমাদের জন্য দুষ্কর হয়েছে। ফলে সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের আজ্ঞাবহ সাজতে বাধ্য হচ্ছি। অথচ তাকওয়ার মতো মানবীয় উন্নতর গুণের অধিকারীদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত কল্যাণের ভাণ্ডার সংরক্ষিত রয়েছে বলে আল-কুরআনে উল্লেখ রয়েছে। সত্যিই মুসলিম দেশগুলোর ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থান অধিকতর এমন উত্তম স্থানে রয়েছে যে, প্রতিটি মুসলিম দেশের মাটির নিচে আল্লাহ তায়ালা অফুরন্ত নিয়ামতের ভাণ্ডার মজুত করে রেখেছেন। আমাদের গোলামি ও পরাজিত মানসিকতার কারণে আল্লাহ দান করছেন না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমাদের বর্তমান মুসলিম দেশগুলোর সরকার প্রধানগণ আল্লাহর ভয়ের চেয়ে সাম্রাজ্যবাদী ইহুদি-খ্রিষ্টানগোষ্ঠীকেই বেশি ভয় করেন। এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘লোকালয়ের মানুষগুলো যদি ঈমান আনত ও তাকওয়া বা ভয় করত তাহলে আমি তাদের ওপর আসমান-জমিনের যাবতীয় বরকতের দোয়ার খুলে দিতাম, কিন্তু তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করল। সুতরাং তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য আমি তাদের পাকড়াও করলাম’ (সুরা আরাফ ৯৬)।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এ আয়াতটি ছিল ইহুদিদের সম্পর্কে। বনি ইসরাইল জাতিকে পৃথিবীবাসীর নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করে আল্লাহ তায়ালা তাদের ইতিহাসকে অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী করেছিলেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘হে বনি ইসরাইল! আমার সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আমি তোমাদের দান করেছিলাম এবং একথাটিও যে আমি দুনিয়ার সমস্ত জাতির ওপর তোমাদের শ্রেষ্টত্ব দান করেছিলাম’ (সুরা বাকারা ৪৮)। পৃথিবীর ইতিহাসের এক দীর্ঘকালব্যাপী তারা এ নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু হঠকারী কর্মকাণ্ড, গোঁড়ামি ও চরমপন্থার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদেরকে নেতৃত্বের আসন থেকে অপসারিত করে মধ্যমপন্থী জাতি হিসেবে ‘উম্মতে মুহাম্মদি সা: হাতে নেতৃত্বের দণ্ড তুলে দিলেন। আল-কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় ইসরাইল জাতির গোঁড়ামির ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। তাদের ঔদ্যত্যে ও সাহসের মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে আল্লাহ ক্রোধ সহসা সে জাতির ওপর আছরে পড়ে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিতে পরিণত হয়। সে বৈশিষ্ট্যগুলো আজ আমাদেরকেও সংক্রমিত করেছে।
ইসলাম ভারসাম্য নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ও বাঁকে ভারসাম্যপূর্ণ নীতির অনুপম শিক্ষা একমাত্র ইসলামই দিয়েছে। রাসূল সা: পুরো মানবসমাজকে ভেতর থেকে এমনভাবে বদলে দিয়েছিলেন যে, ্র সমাজ ও সভ্যতায় ভারসাম্য স্থাপিত হয়েছিল। সম্মান ও মর্যাদার মানদণ্ড বদলে গিয়েছিল। তাকওয়া ছিল সে সমাজের মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড।
তাকওয়া এমন একটি শক্তি, এমন একটি গুণ, যার ওপর ভিত্তি করে মানুষ হক ও বাতিল, ভুল ও সঠিক, ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। যিনি শুধু আল্লাহর ভয়ে সেটিকেই সত্য হিসেবে মেনে নেন যা তিনি নাজিল করেছেন। তিনি সেটিকেই সঠিক মনে করেন, যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। যে কাজ বা প্রথা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আরো অসংখ্য ক্ষতির সৃষ্টি করে, যে সব কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন, সেটিই মানুষের জন্য ক্ষতিকারক। এ ধরনের ক্ষতিকর কাজ থেকে আত্মরক্ষা করা খুবই জরুরি। আর আত্মরক্ষার জন্য জ্ঞানের প্রয়োজন।
জ্ঞানের চাহিদা মেটাবে আল-কুরআন। কারণ, আল-কুরআন আল্লাহরই নাজিল করা। আত্মরক্ষার জন্য আত্মাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। আত্মাকে নিয়ন্ত্রেণে আনার জন্য দরকার বাস্তব ট্রেনিং। পুরো রমজানে আমরা সেই ট্রেনিংই দিয়ে এলাম। রমজানের সিয়াম একমাস জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে আমাদের যেই মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে, সেই মর্যাদাকে অক্ষুণ্ন রাখতে হবে এবং এই তাকওয়াভিত্তিক সমাজ কায়েমে আমাদের অবিরত চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
মনে রাখতে হবে, তাকওয়া গুণসম্পন্ন মর্যাদাশীল জনগোষ্ঠী নিয়ে যে সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠবে, সেটিই হবে আল-কুরআনের সমাজ, ইসলামি সমাজ ও আল্লাহর পছন্দের সমাজ। এ সমাজের প্রতিটি লোক ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর কাছে সম্মানিত হবেন।

প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন