আজ ১৭ই অক্টোবর, ২০১৮ ইং; ২রা কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ; হেমন্তকাল

নেত্রকোনার কেন্দুয়ার রোয়াইলবাড়ী দুর্গ পুনঃ খনন

  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

নেত্রকোনার-কেন্দুয়ার-রোয়াইলবাড়ী-দুর্গ-পুনঃ-খনন-696x418জেলার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ী দুর্গটি অর্পূব এক স্থাপত্য শৈলির ঐতিহাসিক নির্দশন। এ দুর্গে শুরু হয়েছে নতুন করে পুনঃখনন কাজ। এতে দুর্গের দক্ষিন প্রান্তে আবিষ্কার হচ্ছে প্রাচীর তোরণ ওয়াচ টাওয়ারসহ বিভিন্ন রকমের পুরার্কীতি।

প্রায় ১০ ফিট প্রস্থ তোরণের চারকোণে চারটি ওয়াচ টাওয়ারের মধ্যে ৩টি উন্মোচিত হয়েছে। ওয়াচ টাওয়ারের নির্মানশৈলী ব্যতিক্রম বৈশিষ্টের। লাল পাতলা ইট, মাঝারী পাথর এবং ইট সুরকির সাথে এক প্রকার মশলা কষ দিয়ে গোলাকৃতি ঢালাই দ্বারা নির্মিত।

প্রতিটা ওয়াচ টাওয়ারের গোলাকার ব্যাসার্ধ ৬/৭ ফিট। প্রায় ২ ফিটের মতো মাটি খুঁড়ে তা আবিষ্কার করা হয়েছে।আজ সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ৫/৬জন লোক খনন কাজ করছেন। কথা হয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাহাবুব উল আলমের সঙ্গে।

তিনি জানান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাব হোসেন এবং এই এলাকাটি যার অধিন ঢাকা বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক বাখী রায়ের নির্দেশ ও পরামর্শে গত এপ্রিল মাসের ২১ তারিখ হতে দ্বিতীয়বার খনন কাজ শুরু হয়েছে।

এ কাজে আমার সঙ্গে অংশ নিয়েছেন গবেষণা সহকারী সাবিনা ইয়াসমিন, সিনিয়র নকশা অংকনকারী তৃপ্তি রানী হালদার, আলোকচিত্রি মোজাহার হোসেন, হিসাব রক্ষণ মিজানুর রহমান।

আমরা আরো ২/৩ মাস এখানে খনন কাজ করবো। এ দুর্গের স্থাপত্যশৈলীতে ভিন্নতা খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে। অন্যান্য পুরার্কীতির চেয়ে এ দুর্গের পুরাকীর্তির বৈশিষ্ট ভিন্ন রকম। আরোও অনেক কিছু পাওয়ার আশা করছি।

তিনি আরোও জানান, এটি মুঘল যুগের অথবা তার পূর্বে সুলাতানী আমলের শেষ দিকে নির্মিত হয়ে থাকবে। এ দুর্গটিকে কোটবাড়ী দুর্গও বলা হয়। রোয়াইলবাড়ী শব্দটি আরবি এবং বাংলা শব্দের সংমিশ্রণে। রেল বা রালা যার অর্থ অগ্রবর্তী, অর্শ্বারোহী সৈন্যদল।

আর বাড়ি হচ্ছে স্থাপনা। এই হল রয়েলবাড়ী বা রোয়াইলবাড়ী নামের বৈশিষ্ট্য। এখানে স্থাপত্যশৈলীর চমৎকার বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে অন্যান্য। এটি কোনো সেনা নায়কের বাসভবন হতে পারে।

এ দুর্গের চর্তুদিকে পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। দুর্গের দক্ষিণ প্রান্তে এখন খনন কাজ চলছে। এখানের এটি তোরণ বা ফটক। উত্তরে উঁচু বুরুজ ঢিবি, পশ্চিমে বেতাই নদী, পশ্চিম দিকে শানবাঁধানো পুকুর।

এর চর্তুদিকে প্রাচীর ছিল যা উন্মোচনের চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন সূত্রে আরোও জানা গেছে, এ দূর্গটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং নির্মাণশৈলীর কারণে ১৯৮৭ ইং সনে সরকার এটিকে পুরার্কীতি হিসেবে ঘোষণা করে।

কেন্দুয়া সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার দক্ষিন-পশ্চিমে বেতাই নদীর তীরে এটির অবস্থান। গঠনশৈলীর কারণে প্রত্নতত্ত্বিকরা এটিকে মহাজাদপুর এবং গৌড়ের ১৪ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

তাদের ধারণা এটি মুঘল আমলের কোনো সেনা নায়কের বাসভবন। তবে এখন পর্যন্ত নির্মাণ তারিখ উদ্ধার করা যায়নি।

দূর্গটির পশ্চিমে বেতাই নদী এবং তিনদিকে তিনটি পরিখা দ্বারা বেষ্টিত কয়েকটি চৌকিও রয়েছে। এছাড়া রয়েছে সিংহদ্বার। দুর্গের অভ্যন্তর ভাগ পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা একটি ইটের প্রাচীর দ্বারা দু’অংশ বিভক্ত।

উত্তরের অংশটির আয়তন ৪৯৭ বগফুট। এটি পূর্ব-পশ্চিমে প্রাচীর দ্বারা আবদ্ধ। উত্তরের অংশে বুরুজ ঢিবি, শানবাঁধানো পুকুর ও একটি কবরস্থান। দক্ষিনে আছে বারদুয়ারী ঢিবি ও ৪টি ওয়ার্চ টাওয়ার সম্বলিত বিশাল তোরণ।

পুরার্কীতি এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে অশংখ পাথর। ১৯৯১-৯২ এবং ৯২-৯৩ অর্থ বছরে এর অভ্যন্তরে প্রথম খনন কাজ পরিচালনা করা হয়। বুরুজ ঢিবি খননে একটি ইমারত কাঠামো এবং বারদুয়ারী ঢিবিতে মসজিদের নকশা সাদৃশ্য আবিকৃত হয়।

বুরুজ ঢিবির উচ্চতা দূর্গ চত্বর হতে প্রায় ২০ ফুট। চূড়ায় আরোহনের জন্য বিশেষ সিঁড়ি ছাড়াও আবিষ্কৃত হয় মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ, পূড়ামাটির তেরাব এবং লাল রংয়ের প্রলেপযুক্ত ইট।

বারদুয়ারী ঢিবি খননে ৭৪ফুট/৪৬ফুট আয়তনের একটি মসজিদের নকশা, এর পূর্ব দেয়ালে পাঁচটি, উত্তর দেয়ালে তিনটি দরজা এবং পশ্চিম দেয়ালে পাশাপাশি তিনটি মেহরাব ছিল বলে ধারণা করা হয়। প্রতি সারিতে রয়েছে ৪টি করে ৮টি পিলার।

দেয়ালে পোস্টারের চিহ্ন নেই। দেয়ালের বহিরাবরণে পোড়ামাটির অলংকৃত ইট, ঝিনুক ও বিশেষ ধরণের মসলা ব্যবহৃত হয়েছে।

পুরার্কীতি দ্বিতীয় খনন কাজ পরিদর্শনে এসেছিলেন কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মুতাসিমুল ইসলাম।তিনি বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। সরকারি উদ্যোগে এটি দ্বিতীয় খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আশাকরি স্থাপত্য শিল্পের অনেক কিছু আবিকৃত হবে। জেলা প্রশাসনসহ আমরা সার্বক্ষনিক খোঁজখবর রাখছি।

এলাকাবাসীর দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন ভূঞা বলেন, সরকার এলাকাটিকে পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করলে সরকারও লাভবান হবে এবং কেন্দুয়ার ঐতিহ্য আরোও বৃদ্ধি পাবে। তাই এটিকে পর্যটনের আওতায় নেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবী জানাচ্ছি।

প্রিন্ট করুন
মন্তব্য করুন