বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৫:০৪ পূর্বাহ্ন

নৈসর্গিক এনায়েতপুর, পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা

নৈসর্গিক এনায়েতপুর, পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা

হাওড়-বাওড় আর মইষের শিং -এই নিয়ে ময়মনসিংহ। প্রিয় পাঠক, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি আমাদের এই প্রিয় ময়মনসিংহ বিভাগ। বিশ্বায়নের এই যুগে অন্যান্য বিষয়ের সাথে পর্যটনও সমানভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। তাহলে আমরা কেন পিছিয়ে থাকবো? ঠিক সে কারণেই ময়মনসিংহ বিভাগের ছোট-বড়, পরিচিত-অপরিচিত সকল পর্যটন কেন্দ্র ও সম্ভাবনা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগভিত্তিক প্রথম ও পাঠকনন্দিত অনলাইন পত্রিকা “ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪“। সেই ধারাবাহিকতার আজ দ্বিতীয় পর্বে থাকছে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় অবস্থিত নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের এনায়েতপুর ইউনিয়ন ও এর পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন-

enayetpur-salim-md24-01

আলাদীনস পার্ক, এনায়েতপুর, ফুলবাড়ীয়া -ছবি: শফিকুল ইসলাম সেলিম/ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪

শফিকুল ইসলাম সেলিম: ভৌগোলিক অবস্থানের দিক দিয়ে ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলা সদর থেকে সর্ব দক্ষিণের লালমাটি অধ্যুষিত পাহাড়ি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এনায়েতপুর ইউনিয়ন। ৯৭৮৫ একর আয়তন বিশিষ্ট ইউনিয়নটিতে মোট জনসংখ্যা রয়েছে ২৩৩৭৭ জন (পুরুষ ১১৮৬২ জন এবং মহিলা ১১৫১৫ জন)।

মোট জনসংখ্যার অধিকাংশই কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধান ক্ষেত, রাশি রাশি আম, কাঁঠাল, মেহগনি, আকাশি গাছের সমারোহে সমৃদ্ধ এই ইউনিয়নটিতে শিক্ষার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭.৬২%।

ইউনিয়নটির বুক চিড়ে বয়ে গেছে স্রোতস্বিনী উত্তাল বাজুয়া নদী। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের দলবেঁধে নদীতে সাঁতার কাটার দৃশ্য যে কারও মনকে তার শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে। ডাহুক, পানকৌড়ি ও শীতকালে অতিথি পাখিদের সমাগমে চারপাশের সৌন্দর্য্য বহুগুণে বেড়ে যায়। নদীর কূল ঘেঁষে জেলেদের বাস। বর্ষামৌসুমে পূর্ণ যৌবনবতী বাজুয়ার বুকে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে জেলেদের মাছ ধরতে দেখা যায়। কিছুক্ষণের জন্য হলেও চোখের সামনে ভেসে উঠে পদ্মাপাড়ের সেই কুবের মাঝির প্রতিরূপ।

enayetpur-salim-md24-02

আলাদীনস পার্ক, এনায়েতপুর, ফুলবাড়ীয়া -ছবি: শফিকুল ইসলাম সেলিম/ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪

কৃষি-অর্থনীতি নির্ভর পাহাড়ি অঞ্চলের শান্তিপ্রিয় মানুষদের নানা রকমের পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙ্গে। অতঃপর কর্মব্যস্ততায় নেমে পরে কৃষিজীবী মানুষজন। পুরুষদের পাশাপাশি এ অঞ্চলের মহিলারও বেশ পরিশ্রমী। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় দলবেঁধে শ্রমজীবী মহিলাদের হলুদ তোলার দৃশ্য আপনাকে অবাক করতে পারে। এনায়েতপুরের উৎপাদিত হলুদ দেশের বিভিন্ন জায়গায় রপ্তানি হয়। তাছাড়া এখানকার কৃষকদের প্রধান অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে শিম, লাউ, বেগুন, করলা, বরবটি বেশ উল্লেখযোগ্য। কাগজি ও বাতাবিলেবু চাষের দিক দিয়েও এনায়েতপুর সমৃদ্ধ।

এক সময় এই জনপদের মানুষজন কৃষির উপর নির্ভর থাকলেও বর্তমানে কৃষি ও শিল্প বিপ্লবের ফলশ্রুতিতে মানুষজন নতুন নতুন কৃষি ও শিল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ায় ভাগ্যের চাকা পরিবর্তন হয়েছে অনেকের। অধিকাংশ মানুষই এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ডিম উৎপাদনকারী (লেয়ার) ও মাংস উৎপাদনকারী (ব্রয়লার) মুরগীর খামার প্রতিষ্ঠা করে অর্থনৈতিক দৈন্যতার অবসান ঘটিয়েছে। এখানকার উৎপাদিত ডিম ও মুরগী দেশের বিভিন্ন প্রান্তসহ দেশের বাহিরে রপ্তানী হয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে।

enayetpur-salim-md24-03

আলাদীনস পার্ক, এনায়েতপুর, ফুলবাড়ীয়া -ছবি: শফিকুল ইসলাম সেলিম/ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪

পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় এনায়েতপুরে বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে রয়েছে ময়মনসিংহের বিখ্যাত আলাদীনস্ পার্ক। সকল আধুনিক রাইড সম্বলিত প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা পার্কটি বাংলাদেশের নান্দনিক ও সমৃদ্ধ বৃহৎ পার্কগুলোর মধ্যে অন্যতম। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের পাদচারণায় মুখরিত হয় চারপাশে সবুজে ঘেরা এই আলাদীনস্ পার্কটি। চাইলে আপনিও পরিবার পরিজন নিয়ে নির্বিঘ্নে ঘুরে যেতে পারেন।

enayetpur-salim-md24-04

আলাদীনস পার্ক, এনায়েতপুর, ফুলবাড়ীয়া -ছবি: শফিকুল ইসলাম সেলিম/ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪

নান্দনিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এনায়েতপুরের প্রতিটি গ্রাম। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি মেঠোপথ ধরে হাঁটলে রাস্তের ধারে লাগানো খেজুঁর গাছে ঝুঁলে থাকা মিষ্টি খেজুর রসের হাড়ি আপনাকে মুগ্ধ করবে। সবুজের সমারোহে সমৃদ্ধ দিগন্ত জোড়া মাঠ, মনমাতানো দখিনা হাওয়া আপনার মনকে স্বর্গীয় সুষমায় ভরিয়ে তুলবে। বসন্তে পূর্ণতা পাওয়া আমের মুকুল, শিমুল-পলাশের নান্দনিক সৌন্দর্য আপনার মনকে পূর্ণ তৃপ্তিতে ভরিয়ে তুলবে।

ফুলবাড়িয়ার পরিচিত বৃদ্ধিতে যোগ হয়েছে এনায়েতপুরের আরও একটি উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্র “দীপ্ত অর্কিড গার্ডেন“। ১১ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত দৃষ্টিনন্দন মনোমুগ্ধকর এ বাগানে সাত জাতের একুশ ধরনের মোট তিন লাখ অর্কিড রয়েছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের একমাত্র অর্কিড গার্ডেনে রয়েছে রং-বেরঙ্গের অর্কিড ফুল। প্রতিদিন শত শত পর্যটক ভিড় জমায় অনিন্দ্যসুন্দর অর্কিড ফুল দেখতে।

অর্কিড বাগান, এনায়েতপুর, ফুলবাড়ীয়া -ছবি: শফিকুল ইসলাম সেলিম/ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪

অর্কিড বাগান, এনায়েতপুর, ফুলবাড়ীয়াছবি: শফিকুল ইসলাম সেলিম/ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪

নান্দনিক “ড্যান্সিং লেডি” ফুলগুলো যে কারোরই খারাপ মনকেও ভালো করে দিতে পারে সহসাই। এখানে উৎপাদিত অর্কিড ইউরোপ, আমেরিকার বাজারগুলোতে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় যা আমাদের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। ইতোমধ্যে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেরই আগমন ঘটেছে এনায়েতপুরের দীপ্ত অর্কিড গার্ডেনে। চাইলে আপনিও ঘুরে যেতে পারেন এখান থেকে।

ডিম উৎপাদনকারী থাইল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান সিপি বাংলাদেশ ও চীনের কোম্পানীগুলোর প্রতিষ্ঠান রয়েছে এনায়েতপুরে। তাছাড়া ফুলবাড়িয়ার প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যে অন্যতম আখের রস যা থেকে প্রাকৃতিকভাবে লাল চিনি উৎপাদনের জন্যও এনায়েতপুরের খ্যাতি রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, যীশু খ্রীষ্টের (ইসলাম ধর্মমতে নবী ঈসা (আঃ)) জন্মের পূর্বে গ্রীক ইতিহাসবিদগণ  আঁখ নিয়ে লিখে গিয়েছিলেন যে, “ব্রহ্মপুত্রের তীরে এক ধরনের গুচ্ছ গুচ্ছ গাছ হয় যা থেকে সুমিষ্ট রস বের হয়।”

এছাড়া, ফুলবাড়িয়ার পূর্ব নাম ছিল গোবিন্দগঞ্জ। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রাচীনকালে ফুলবাড়ীয়ায় “ফুলখড়ি” নামক এক ধরনের লাকড়ি জাতীয় গাছ জন্মাত। যা অত্র এলাকার মানুষ লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার করতো। ধারণা করা হয়ে থাকে, সেই ফুলখড়ি থেকেই ফুলবাড়িয়া নামের উৎপত্তি হয়েছে। এখনো সেই ফুলখড়ি গাছের ব্যপক উৎপাদন রয়েছে ৯নং এনায়েতপুর ইউনিয়নে।

অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত ছোট্ট এই জনপদটি পর্যটন মন্ত্রণালয় ও পর্যটন কর্পোরেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় আরো সমৃদ্ধ পর্যটন এলাকায় রুপান্তরিত হতে পারে।

– লেখক:
শফিকুল ইসলাম সেলিম,
আহবায়ক,
ঢাকা মহানগর উত্তর,
বাংলাদেশ আওয়ামী পর্যটনলীগ।

বাংলাদেশ সময়: ২১৩৫ ঘণ্টা, জানুয়ারি ২৭, ২০১৭/এম কে

প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন
শেয়ার করুন:
  • 515
    Shares





©সর্বস্বত্ব ২০১৬-২০২০ সংরক্ষিত