আজ ১৭ই আগস্ট, ২০১৮ ইং; ২রা ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ; শরৎকাল

ফুলবাড়ীয়ায় কিংবদন্তী’র ডাকাত ভিটা, পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হাওড়-বাওড় আর মইষের শিং -এই নিয়ে ময়মনসিংহ। প্রিয় পাঠক, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি আমাদের এই প্রিয় ময়মনসিংহ বিভাগ। বিশ্বায়নের এই যুগে অন্যান্য বিষয়ের সাথে পর্যটনও সমানভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। তাহলে আমরা কেন পিছিয়ে থাকবো? ঠিক সে কারণেই ময়মনসিংহ বিভাগের ছোট-বড়, পরিচিত-অপরিচিত সকল পর্যটন কেন্দ্র ও সম্ভাবনা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগভিত্তিক প্রথম ও পাঠকনন্দিত অনলাইন পত্রিকা “ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪“। সেই ধারাবাহিকতার আজ প্রথম পর্বে থাকছে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় অবস্থিত কিংবদন্তী’র ডাকাত ভিটা ও এর পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন-

জাহাঙ্গীর আলম: ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়ীয়া উপজেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে আখিলা নদীর তীরে ডাকাত ভিটা অবস্থিত। চারদিকে নিম্নাঞ্চল পরিবেষ্টিত উচু ভিটার মত জায়গাটার নাম ডাকাত বিটা।  যাকে ঘিরে প্রচলিত আছে ভিন্ন ভিন্ন লোক কাহিনী।

ছবি: জাহাঙ্গীর আলম/ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪
কিংবদন্তীর ডাকাত ভিটা -ছবি: জাহাঙ্গীর আলম/ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪

প্রচলিত কাহিনী গুলোর মাঝে সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনীটি এরকম:

তিন-চার শত বছর পূর্বে বন্যার সময় ভেলায় ভেসে এসে এক শিশু (মতান্তরে) শিশুসহ মহিলা আশ্রয় নেয় বর্তমান বরুকা গ্রামের কোনাপাড়ায়। সেখানে একজনের আশ্রয়ে বেড়ে উঠে সে। যার নাম ফকির আলী। কিশোর বয়সে ফকির আলী এলাকার অন্যদের সাথে গরু কিনতে যায় পশ্চিমের কোন হাটে। যাওয়ার পথে মধুপুরের কোন এক এলাকার রাস্তায় বিশ্রাম নেওয়ার সময় পরিচিয় হয় এক অশীতিপর বৃদ্ধের সাথে। এক পযার্য়ে বৃদ্ধ ফকির আলীকে বলে, “তোমার গরু কিনতে যেতে হবে না। তুমি আজ আমার এখানে থেকে যাও।” বৃদ্ধের কথায় ফকির আলী থেকে যায় তার কাছে।

কথা প্রসঙ্গে বৃদ্ধ লোকটি জানায়- “তোমাদের বাড়ির পার্শ্বে যে ডাকাতের বিটাটা রয়েছে, সেখানে অনেক সম্পদ অাছে। ঐ সম্পদের তুমিই হকদার। আল্লাহ মনে হয় সম্পদের হকদার হিসেবেই তেমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছে।” বৃদ্ধ আরও বলে- “ঐ ভিটায় তিনটি কাঁঠাল গাছ আছে। ভিটার উত্তর দিক হতে সরু রাস্তাদিয়ে ঢুকলে প্রথমে যে কাঁঠাল গাছটি পড়ে, ঐ গাছের গর্তে প্রচুর টাকা আছে। প্রথম গর্তের টাকা তুমি নিবে, অন্য গর্তের টাকা দিয়ে একটি মসজিদ করে দিবে এবং তুমি নিজে হজ্ব করবে।”

dakat-vita-md24-04
ডাকাত ভিটার কাঁঠাল গাছ। কথিত আছে শত শত বছর আগে ডাকাতরা এই কাঁঠাল গাছে টাকা লুকিয়ে রাখতোছবি: জাহাঙ্গীর আলম/ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪

সেখান থেকে ফিরেই ফকির আলী তার মাকে নিয়ে প্রবেশ করে ডাকাত ভিটায় এবং পেয়ে যায় গুপ্তধন। সেই টাকায় ফকির আলী তৈরি করে একটি মসজিদ এবং নিজে হজ্ব করে আসে। বাকী টাকা দিয়ে সম্পদ ক্রয় করে সে।

dakat-vita-md24-06
কথিত আছে, ডাকাত ভিটার কাঁঠাল গাছ থেকে প্রাপ্ত টাকায় নির্মিত হয়েছে এই মসজিদ -ছবি: আখিলা, ফুলবাড়ীয়া সাহিত্য সংসদ

ভিন্ন মতটি এরকম:

গরু কিনতে গিয়ে ফকির আলী হারিয়ে যায়। অন্য সবাই চলে আসলেও ফকির আলী পথের ধারে বসে কাঁদতে থাকে। এমন সময় ঐ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো একদল ডাকাত। তারা ফকির আলীর কাছে সব শুনে তার ঠিকানা জানতে চায়। ঠিকানা জানার পর তারা তাকে ডাকাত ভিটার ঐ কাঁঠাল গাছটির সন্ধান দেয় এবং ঘোড়ায় করে তাকে পৌঁছে দেয় তার বাড়ির কাছাকাছি কোন এক জায়গায়। টাকা নেয়ার শর্ত ঐ একই।

যে কাঠাল গাছটিকে নিয়ে গল্প সেটি জ্বিনের দখলে আছে এটিই ছিল পূর্বেকার মানুষের বিশ্বাস। এমন কথাও প্রচলিত আছে যে ঐ গাছের ডাল কাটাতে গিয়ে অনেকেই মৃত্যু বরণ করেছেন!

ডাকাত ভিটায় অবস্থিত ঈদগাহ মাঠ -ছবি: জাহাঙ্গীর আলম/ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪
ডাকাত ভিটায় অবস্থিত ঈদগাহ মাঠ ছবি: জাহাঙ্গীর আলম/ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪

ঐতিহাসিক ভিত্তি:

এদেশে ইংরেজ আগমনের পরপর যে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল, তারই এক পর্যায়ে ইংরেজদের আক্রমনের ফলে ছত্রভঙ্গ হয়ে ফকির-সন্ন্যাসীরা আশ্রয় নিয়ে ছিল মধুপুরের বিভিন্ন এলাকায়। ইতিহাসবিদদের মতে, তৎকালীন সন্ন্যাসীরা নাম পরিবর্তন করে বিভিন্ন জনপদে আশ্রয় নিয়ে লুটপাট চালাতো। এদেরই কোন দল হয়ত আশ্রয় নিয়েছিল দুর্গম এ ভিটায়। তারপর থেকেই হয়তো ঐ ভিটার নাম “ডাকাত ভিটা”। তারাই হয়তো টাকা-পয়সা জমিয়েছিল ঐ কাঁঠাল গাছের গর্তে। ভেলায় ভেসে আসার গল্পটুকু বাদ দিলে কোন কারণে নিহত ডাকাতের বিধবা স্ত্রী-সন্তানসহ আশ্রয় নিয়েছিলেন পার্শ্ববর্তী গ্রামে, আর ভেসে আসার গল্পটাুকু ছিল আশ্রয় পাওয়ার স্বার্থে বানানো। ফকির আলী গরু কিনতে যাওয়ার গল্প এবং সেখানে বৃদ্ধের সাথে সাক্ষাৎ ছিল একেবারেই স্বাভাবিক। কারণ, পূর্বেই বলা হয়েছে ছত্রভঙ্গ ফকির-সন্ন্যাসীরা মধুপুরের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল।

ডাকাত ভিটার প্রথম নির্মিত বাড়ি এটি -ছবি: জাহাঙ্গীর আলম/ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪
ডাকাত ভিটার প্রথম নির্মিত বাড়ি এটিছবি: জাহাঙ্গীর আলম/ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪

বর্তমান অবস্থা:

আজ থেকে ৬০/৭০ বছর পূর্বেও ডাকাত ভিটায় কোন মানুষের বসবাস ছিল না, ছিল জঙ্গলাকীর্ণ উচু ভূমি। ডাকাত ভিটায় প্রথম বাসস্থান নির্মাণকারী মোসলেম উদ্দিন বলেন, তাকে ছাড়াও বর্তমানে ৮/১০ টি পরিবার ওখানে বাস করে। এখানে একটি ঈদগাহ মাঠ আছে, সম্পূর্ণ ভিটাই এখন মানুষের লাগানো আকাশি, মেহগনি-সহ বিভিন্ন গাছে পরিপূর্ণ।

বর্তমান অবস্থা
ডাকাত ভিটার বর্তমান অবস্থা, গড়ে ওঠেছে লোকবসতি -ছবি: জাহাঙ্গীর আলম/ময়মনসিংহ ডিভিশন ২৪

দুই/তিন বছর পূর্বে রহস্যজনকভাবে আগুন লাগে ঐতিহাসিক কাঁঠাল গাছটিতে। আগুন লাগার পরও বেঁচে আছে গাছটি। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আখিলা নদী এখন মৃতপ্রায়।

বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজারো লোক কাহিনীর অংশ হয়ে বেঁচে আছে ডাকাত ভিটা ও কাঁঠাল গাছটি। আরও কিছু দিন হয়তো বেঁচে থাকবে কাঁঠাল গাছটি। এক সময় কালের গর্ভে গাছটির সাথে হারিয়ে যাবে কাহিনীটিও।
তথ্যসূত্র: বাংলা একাডেমী প্রকাশিত বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা – ময়মনসিংহ।
– লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, ফুলবাড়ীয়া প্রতিদিন।

 

সম্পাদকের মন্তব্য : ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় অবস্থিত কিংবদন্তী’র ডাকাত ভিটা ও এর পর্যটন সম্ভাবনার বিষয়ে  ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলো।

প্রিন্ট করুন
মন্তব্য করুন