আজ ১৭ই অক্টোবর, ২০১৮ ইং; ২রা কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ; হেমন্তকাল

শৈশবের একাল-সেকাল এবং অন্যান্য | এম. কে. ফরাজী

  • 26
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    26
    Shares

childhood

খুব ছোটবেলা, ক্লাস ফোর/ফাইভে যখন পোড়াবাড়ী বাজারে কেজি স্কুলের বোর্ডিংয়ে থাকতাম, তখন মাঝেমধ্যে বাড়ির কথা মনে হলেই কান্নাকাটি শুরু করে দিতাম। এই কান্না যতটা ছিল মায়ের প্রতি টান, তার চেয়ে বেশী ছিলো ফটিকের মতো ছুটি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা!

 

কারণ, আমার বয়সী সব ছেলেমেয়েরা যখন শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় বউচি, কানামাছি, দাঁড়িয়াবান্দা আরও বিভিন্ন ধরনের ও বাহারি নামের খেলাধূলা করতো, আমি তখন স্কুলের ব্যস্ত ক্লাশরুটিনের চাপে পিষ্ট হতাম। তারা যখন জ্যোৎস্না ভরা সন্ধ্যারাতে দাদীর কাছে কিচ্ছা শুনতো, আমি তখন স্কুলের কোচিংয়ে জটিল অংকের সমাধান মেলাতে গলদঘর্ম হয়ে যেতাম। হয়তো বর্ষার শুরুতে খাল-বিল-নদীতে যখন নতুন জল আসতো, ওরা দলবেঁধে মাছ ধরতে যেত, ভরা পুকুরে সাঁতার কাঁটতো, আমি তখন চুলে নারিকেল তেল দিয়ে পরিপাটি স্কুলড্রেস পড়ে কোন সাময়িক পরীক্ষা দিতে বের হতাম।

 

তাই, বোর্ডিংয়ে মাঝেমধ্যেই কান্নাকাটি করতাম। তখন স্যার ছুটি দিতেন আর আমি যেন প্রাণ ফিরে পেতাম। একরাতের কথা বেশ মনে পড়ে। রাত সাড়ে নয়টা/দশটার দিকে আমার কান্না শুরু হলো। বোর্ডিংয়ের বড়ভাই, ক্লাশমেটস সবাই বোঝাচ্ছেন, আমার কান্না থামে না। তখন বোর্ডিংয়ের বাচ্চু স্যার তার বাইসাইকেলের পেছনে বসিয়ে আমাকে বাড়ি নিয়ে গেলেন। গ্রামাঞ্চলে তখন মধ্যরাত। এত রাতে আমাকে দেখে আব্বা-আম্মা হতবাক! আমি সেই রাতে যে শান্তিতে ঘুমিয়েছিলাম, আমার জীবনে তেমন রাত আর আসেনি!

254745_254539151231430_100000260401835_980260_6618561_n-1

আমার ছেলেবেলা এমনই ছিল। পরীক্ষা শেষে একটানা এক সপ্তাহের ছুটি কোনদিন পাইনি। আমার জন্য আব্বা-আম্মাকেও অনেক স্যাক্রিফাইজ করতে হয়েছে। এমনও হয়েছে যে, টানা কয়েকবছর কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় নি!!! লেখাপড়ার ফাঁকে যেটুকু সময় পেতাম ছেলেবেলার মজাগুলো নিতে চেষ্টা করতাম। গ্রামীণ খেলাধূলায় তেমন পারদর্শী ছিলাম না, তবু খেলতাম। কোনদিন জলে নেমে মাছ ধরতে পারিনি, তবু চেষ্টা করতাম। জোর করে দাদীর কাছে কিচ্ছাকাহিনী শুনতাম। আমি যেন তখনই বুঝে গিয়েছিলাম, “সময় গেলে সাধন হবে না…।”

 

বঞ্চিত ছেলেবেলা পার হয়ে এখন তাই ‘হোম সিকনেস’ বেড়ে গিয়েছে আমার। এখন সারাক্ষণ আমার মনে একই চিন্তা কখন বাড়ি যাব! এই অবস্থার শুরু কয়েকবছর আগে থেকে। যখন ময়মনসিংহ বা ঢাকায় থাকতাম, সকালে ঘুম থেকে ওঠে মন খারাপ হলে বাড়িতে গিয়ে নাস্তা করতাম। কিন্তু, এখন চাইলেই যাওয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া এভাবে চলতে পারে না। আমার মনে হয় এটি একটি মারাত্মক রোগ!

6828828759_e3dc7b1f3c_b

তবে, আমাদের সময় শিক্ষক-অভিভাবকগণ তেমন আক্রমণমুখী ছিলেন না। তারা ছিলেন সহনশীল। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য চাপ দিতেন, তবে, তা ছিল যৌক্তিক মাত্রায়। কখনোই ওভার প্রেশার দিতেন না। কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতেন, যা তখনকার প্রেক্ষাপটে দরকার ছিল। সেই নিয়ন্ত্রণের ফলেই একঝাঁক সফল স্টুডেন্ট বেরিয়ে এসেছিল।

 

কিন্তু, বাংলাদেশে এই রোগ মহামারী আকার ধারণ করতে দেরি নেই। শিশুদের কাঁধে আধমণ ওজনের স্কুলব্যাগ চাপিয়ে, পেছনে রাখালের মত হুটহাট করার অভ্যাস বাড়ছে অভিভাবকদের মাঝে। ক্লাশে ফার্স্ট হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতার ফলে শিশুদের কোমল মনে হিংসা-বিদ্বেষ বাড়ছে। এর ফলাফল হচ্ছে আরও ভয়াবহ! শিশুরা অধিক শাসনে পথভ্রষ্ট হয়ে বিভিন্ন অপরাধকর্মে লিপ্ত হচ্ছে।

 

তাই, আমার রিকোয়েস্ট, যাদের স্কুলপড়ুয়া ছোট ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন কিংবা আত্মীয়স্বজন আছে, তাদেরকে বেশী প্রেশার দিবেন না। লেখাপড়ার চাপ কিছুটা কমিয়ে ওদেরকে ওদের মত সময় কাটাতে দিন। লেখাপড়া সারাজীবন করতে পারবে। কিন্তু, শৈশব চলে গেলে ফিরে আসবে না। শিশুদের শৈশব থাকুক দুষ্টুমি, খেলাধূলা আর রোমাঞ্চে ভরপুর। আজকের শিশুরাই আগামীদিনের ভবিষ্যৎ। সুতরাং, ভবিষ্যতের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে গেলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে।

 

-মোঃ মেহেদী কাউসার ফরাজী,

০৮/১০/২০১৬ ইং

বর্ধমান, ভারত।

প্রিন্ট করুন
মন্তব্য করুন