বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:৩৫ অপরাহ্ন

ক্ষীরু নদীর গল্প (১ম পর্ব) | এম.কে. ফরাজী

ক্ষীরু নদীর গল্প (১ম পর্ব) | এম.কে. ফরাজী

IMG_20151211_192633

 

ডিসেম্বর মাসের রাত।

 

চারদিকে গাঢ় অন্ধকার, অনতিদূরেই শিয়ালের হুক্কহুয়া রব শোনা যাচ্ছে। পরিবেশটা ভীতিকর। কিন্তু, ক্ষীরু নদীর তীরে ঘন ঝোঁপের ভিতরে বসে থাকা তিনজনের কোন ভয় হচ্ছে না, বরং চাপা উত্তেজনায় এই শীতের মাঝেও তারা প্রচন্ড ঘামছে। এই তিনজন খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। একই গ্রামের তিনজন, প্রত্যেকের নামও প্রায় একইরকম! রাকিব,সাকিব ও নকিব।

 

রাকিব প্রতিদিন নিয়ম করে বিকেলবেলা একঘন্টা ঘুমায়। আজও যথারীতি ঘুমাচ্ছিল। ঘুমের মাঝে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখলো সে। ফলে, ঘুম ভেঙে গেল তার, বুকটা প্রচন্ড ধরফর করতে লাগল। সে সোজা চলে গেল ক্ষীরু নদীর তীরে। গিয়েই নদীর তীরঘেঁষা একটা বিশাল আমগাছের বেরিয়ে যাওয়া শিকড়ের ওপর বসে পড়ল। তারপরই চিৎকার করে কান্না শুরু করল।

 

শীতকালে গ্রামাঞ্চলের নদী তীরবর্তী জায়গায় কৃষকেরা নানা জাতের সবজি চাষ করে। রাকিব যেখানে বসে কাঁদছে, তার ডানে-বাঁয়ে, সামনে পিছনে হরেক রকমের সবজি খেত রয়েছে। এসব ক্ষেতের উর্বরতা রক্ষা ও পানির অভাব দূর করে এই নদী। নদীর দুই পাশের গ্রামগুলোর হাজার হাজার মানুষকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করছে এই নদী। অথচ, এই নদীরই আজ কি হাল হয়েছে!

 

রাকিব যখন কাঁদছিল আর এসব ভাবছিল, তখন সাকিব ও নকিব তার পাশে গিয়ে বসল। তাদের দেখে রাকিব কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। তারপর পরিস্থিতি সামলে নিতে মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলল :

 

রাকিব। কিরে, তোরা এখানে?

সাকিব। তোকে খুঁজতে বাড়ি গিয়েছিলাম….

 

সাকিবের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে নকিব বলল, …”হ্যাঁ, চাচী বললেন, তুই ঘুম থেকে ওঠেই নদীর দিকে এসেছিস, তাই চলে এলাম।”

 

নকিবের এই এক বদঅভ্যাস, অন্যের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সে বকবক শুরু করে। সাকিব এ নিয়ে ওর সাথে লেগেই থাকে। তবে, আজ ও কিছু বলল না।

 

রাকিব চোখের জল মোছার বৃথা চেষ্টা করছিল, ওর প্রিয় দুই বন্ধু বিষয়টি ধরে ফেলল। দুজনই একত্রে রাকিবকে প্রশ্ন করল, “তুই কাঁদছিস কেন?”

 

রাকিব বন্ধুদের কাছে মিথ্যে বলল না। সে যে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে কাঁদছে, একথা অকপটে স্বীকার করল। নকিব লাফ দিয়ে ওঠলো স্বপ্নের বিস্তারিত জানার জন্য।

 

রাকিব বলল, “বেশ! তোরা যখন শুনতে চাইছিস, তাহলে বলছি।” এই বলে স্বপ্নে দেখা ঘটনা বিবৃত করতে লাগলো:

 

“আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি এই গাছের নীচে বসে গান গাইছি। এমন সময় হঠাৎ কান্নার আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠলাম। আমি নদীর দিকে তাকিয়ে দেখি যে, নদীর পানিতে মানুষের চেহারার মত একটা আকৃতি তৈরী হয়েছে, আর সেই চেহারার চোখ বেয়ে অঝর ধারায় পানি পড়ছে। আমি দেখে ভয় পেয়ে গেলাম।

 

তখন নদী থেকে আওয়াজ আসলো, রাকিব, এই রাকিব, তুমি ভয় পেয়োনা। আমি তোমার কোন ক্ষতি করব না।

 

আমি বললাম, সত্যি বলছ তো?

 

নদী বলল: হ্যাঁ, আমরা নদীরা মিথ্যা বলি না।

 

আমি: আচ্ছা, তুমি কি কাঁদছিলে?

 

নদী: হ্যাঁ, আমার অনেক কষ্ট, তাই কাঁদছি ভাই।

 

আমি : তোমার কিসের কষ্ট? আমাকে বল, আমি তোমার সব কষ্ট দূর করে দিব।

 

নদী: সত্যি তুমি আমার সব কষ্ট দূর করে দিবে?

 

আমি: হ্যাঁ, আমিও মিথ্যে বলি না।

 

নদী: আচ্ছা, শোন তাহলে আমার দুঃখের কথা।  এই যে, আজকে আমার এই জরাজীর্ণ অবস্থা তোমরা দেখছ, এরকমটা আমি ছিলাম না বুঝলে। আমি আরও অনেক মোটাসোটা,প্রাণবন্ত ও যৌবনবতী ছিলাম। আমার বুকভরা অথৈ জল ছিল, জলভরা মাছ ছিল, নানান জাতের মাছ, টেংরা, গুলশা, বোয়াল, চিতল, ঢেলা সহ আরও কত কী!

আমার বুক বেয়ে বড় বড় স্টিমার চলতো, সওদাগরী মালবোঝাই প্রকান্ড সব জাহাজ, যাত্রীবাহী নৌকা চলতো। নয়াবধূ বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় নীরবে কাঁদতো, তার চোখের নোনতা জল আমার জলে মিশে যেত। প্রতিবছর নৌকাবাইচ হতো আমার বুকে। সোজা কথায় বললে, আমি ছিলাম জগতের সবচেয়ে সুখী।

 

কিন্তু, আজ আমি রুগ্ন দশা, আমার জীর্ণশীর্ণ শরীর, হাঁটুজল নিয়ে আমি মৃত্যুর দিন গুণছি।

 

জান, আমি ত্রিকালদর্শী নদী। গত কয়েকশো বছরের এই জনপদের ঘটনাপ্রবাহ আমি প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু, এসব কথা আমি আর কাউকে বলি নি। কেন জান? আমরা নদীরা মানুষদের খুব ভয় পাই। কারণ, মানুষেরাই তো অকথ্য নির্যাতনের মাধ্যমে আমাদেরকে অকালমৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে!

 

কিন্তু, রাকিব ভাইয়া, তোমার কাছে আমি এসব বলে যাচ্ছি। তোমাকে আমি ভালবাসি। আমাদের নদীদের যারা ভালবাসে, আমরাও তাদেরকে ভালবাসি।

 

তবে, মৃত্যুর আগে তোমাকে একটা ভয়ঙ্কর দুঃসংবাদ দিয়ে যাচ্ছি। আমার মৃত্যু হলে তোমাদের এই জংগলবাড়ী গ্রাম আর থাকবে না, এছাড়া আমার তীরবর্তী মঠবাড়ী, পোড়াবাড়ী, হরিয়াগুনী, বাদামিয়া, কুরুয়াগাছা

ইত্যাদি গ্রামগুলোও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এইসব গ্রামের সকল জীবের মৃত্যু ঘটবে, এমনকি তোমাদেরও!

 

কি ভাবছ? আমার সাথে এসব গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে কেন?

 

হা হা হা…!

 

আচ্ছা, রাকিব, তুমিই বল, মা মরে গেলে তার সন্তান বাঁচে? বল? এই গ্রামগুলো আমার সন্তানের মত, আমার পেটের একটু একটু মাটি জমেই তো এদের জন্ম হয়েছে! আমার বুকেরজল পেয়েই তো এরা এত প্রাণবন্ত হয়ে পড়েছে! তাহলে, আমার মৃত্যু হলে অবশ্যই এদের মৃত্যু হবে। আর, তোমরা তো বইয়ে পড়েছ যে, জলের অপর নাম জীবন! সুতরাং, আমি মরে যাচ্ছি, তোমরাও মরবে। আমাকে তোমরা মেরে ফেললে, তোমরাও বাঁচবে না।”

 

….. এটুকু বলতেই আমার ঘুম ভেঙে গেল, রাকিব বলল।

 

সাকিব ও নকিব মন্ত্রমুগ্ধের মত সবটুকু শুনলো, তাদেরও চোখ ভিজে গেছে। এখন ওদের তিনজনের মাথাতেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে নদীর শেষ কথাটুকু, “আমাকে তোমরা মেরে ফেললে, তোমরাও বাঁচবে না!”

 

( বাকিটুকু পরবর্তী পর্বে )

 

-লেখক:

মোঃ মেহেদী কাউসার,

ছাত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

প্রিন্ট করুন
মন্তব্য করুন
শেয়ার করুন:





©সর্বস্বত্ব ২০১৬-২০২০ সংরক্ষিত