বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:১৪ অপরাহ্ন

প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের ১১ বছর আজ

প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরের ১১ বছর আজ

সিডর

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডলঃ আজ ১৫ নভেম্বর। ‘সিডর’ দিবস। ইতিহাসের ভয়াবহতম প্রাকৃতিক ধ্বংসলীলার দিন। আজ থেকে ১১ বছর আগে ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৩শ’ কিলোমিটার বেগে ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ বলেশ্বর নদীর মোহনা হয়ে উপকূলের ১০টি জেলার জনপদে আঘাত হানে।

সিডরের সেই কালো রাতের ভয়াল দূর্যোগ আজও তাড়া করে ফিরছে উপকূলের মানুষদের। আজও উপকূলের বিভিন্ন জনপদে শোনা যায় স্বজনহারাদের দীর্ঘশ্বাস। ভয়াল এই দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় প্রায় ৩ সহস্রাধীক মানুষের। নিখোঁজের পরিমাণ ছিল আরও সহস্রাধীক। যাদের প্রায় সকলেরই পরবর্তীতে আর কোন হদিস মেলেনি।

সিডর আঘাত হানা উপকূলের ১০টি জেলায় শুধুমাত্র সরকারী হিসেব অনুযায়ী-ই প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়, যার সিংহভাগই ছিল পটুয়াখালী, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা, ঝালকাঠী ও বরিশালে। তবে বেসরকারী সূত্রের মতে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমান ছিল প্রায় বিশ হাজার কোটি টাকারও বেশী।

২০০৭ -এর ১১ নভেম্বর দুপুর ১২টায় আবহাওয়া অধিদপ্তর দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরের আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রায় ২শ’ কিলোমিটার দক্ষিণে একটি লঘুচাপ শনাক্ত করে। লঘুচাপটি নিম্নচাপ থেকে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিয়ে ১৪ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশ উপকূলের ৫শ’ কিলোমিটার দক্ষিণ দিয়ে ক্রমশ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মাঝ বরাবর রায়মঙ্গল-হাড়িয়াভাঙ্গা অভিমূখে অগ্রসর হচ্ছিল। উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের মাত্র ১শ’ কিলোমিটারের মধ্যে চলে আসলেও আকষ্মিকভাবেই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় সুন্দরবন এলাকা অতিক্রমের পরিবর্তে গতিপথ পরিবর্তন করে ঘূর্ণিঝড়টি উত্তরমুখি থেকে উত্তর-পূর্বমুখি হতে শুরু করে।

সন্ধ্যা ৬টার পরেই ঘূর্ণিঝড়টি অতি দ্রুত গতিতে উত্তর-পূর্বমুখি হয়ে ভারত-বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্ত থেকে প্রায় ৩শ’ কিলোমিটার পূর্বে বরগুনা এবং বাগেরহাটের মধ্যবর্তী হরিণঘাটা-বুড়িশ্বর ও বিশখালী নদীর বঙ্গোপসাগর মোহনা দিয়ে প্রায় পৌনে ৩শ’ কিলোমিটার বেগে মূল ভূখন্ডে আঘাত হানতে শুরু করে। ঝড়টির ব্যাপ্তি মাত্র দেড়শ’ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও তার দৈর্ঘ্য ছিল অনেক লম্বা। সে রাতে সাগরপাাড়ের হরিণঘাটা-পাথরঘাটা থেকে প্রায় আড়াইশ কিলোমিটার দূরে বরিশাল পর্যন্ত একই সাথে প্রায় সমান বেগে সিডরের নারকীয় তান্ডব অব্যাহত ছিল।

১৫ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত বাগেরহটের মোড়েলগঞ্জ, শরনখোলা, রামপাল থেকে পিরোজপুর-ঝালকাঠী বরিশাল হয়ে মাদারীপুর, শরিয়তপুর ও গোপালগঞ্জ পর্যন্ত সিডরের তান্ডব অব্যাহত ছিল। একইভাবে ঝড়টি পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার পশ্চিমভাগেও আঘাত হানে। প্রায় পৌনে ৩শ’ কিলোমিটার বেগের ঐ ঝড়ের সাথে প্রায় ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছাস উপকূলীয় অঞ্চলে বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরের বিশাল জনপদ সহ ফসলী জমিকেও লন্ডভন্ড করে দেয়।

ভয়াবহ এ ঘূর্ণিঝড় দেশের উপকূলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলের ৩০টি জেলায় কম-বেশী আঘাত হানলেও দেশের ৭টি জেলার ২শ’ উপজেলার প্রায় সাড়ে ১৭শ’ ইউনিয়নে ক্ষতি ছিল সর্বাধিক। সরকারী হিসেবে ক্ষতিগস্থ পরিবারের সংখ্যা ১৭ লাখ ৭৩ হাজার ধরা হলেও বেসরকারী মতে তা ছিল অন্তত ২০ লাখ এবং ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় পৌনে এক কোটি। সরকারী তথ্যে জানা যায়, ১৫ নভেম্বর সিডরের তান্ডবে দক্ষিণ উপকূলের বিশাল জনপদের প্রায় ৪ লাখ ঘরবাড়ী সম্পূর্ণ ও আরও প্রায় ১০ লাখ আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। একই সাথে প্রায় প্রায় ২লাখ হেক্টর জমির আমন ফসল সম্পূর্ণ ও আরো ৫ লাখ হেক্টর আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। প্রায় ৫০ লাখ গবাদী পশু ও হাঁস-মুরগীর মৃত্যু ঘটে সিডরের কালো থাবায়।

সরকারীভাবে মাত্র ৩ হাজার ১৯৯ জনের মৃত্যু ও ১ হাজার ৭২৬ জনের নিখোঁজ হবার কথা বলা হলেও এ সংখ্যা আরও অনেক বেশী বলে ধারণা করা হয়। বেশীরভাগ নিখোঁজদের আর কোন সন্ধান না মেলায় তাদের সকলকেই সিডরের বয়ে আনা জলোচ্ছাস সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে।

এছাড়াও প্রায় পৌনে ৭শ’ কিলোমিটার আঞ্চলিক ও জাতীয় মহাসড়ক সহ পল্লী যোগাযোগ অবকাঠামো সম্পূর্ণ এবং প্রায় ৯০হাজার কিলোমিটার সড়ক আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বিধ্বস্ত এলাকার প্রায় ১৮শ’ সরকারী-বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ও প্রায় সাড় ৬হাজার আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কের ১ হাজার ৬৫৪টি সেতু ও কালভার্ট সম্পূর্ণ এবং আরও প্রায় ৯শ’টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

ঝড়ের পরেই বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর ৫টি জাহাজ খাদ্য, ঔষধ এবং ত্রাণ সামগ্রীসহ সর্বাধিক ঘূর্ণি ঝড় কবলিত এলাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ইউরোপীয়া কমিশন €১.৫ মিলিয়ন ইউরো ($২.৪ মিলিয়ন ইউএসডি) সমপরিমাণ ত্রাণ সামগ্রি বাংলাদেশকে প্রদান করে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড স্টেট নেভী প্রায় ৩,৫০০ জন নৌ সেনা ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমে সাহায্যের জন্য প্রেরণ করে। অন্যান্য দাতা সংস্থাও সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। এর মধ্যে ওয়ার্ল্ড ভিশন ২০,০০০ ঘড়ে গৃহহীন লোকজনের গৃহ নির্মানে সাহায্যের জন্য স্বেচ্ছাসেবক প্রেরণ করে। পাশাপাশি রেড ক্রস এ উদ্ধার তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ইউএনডিপি, ইউনিসেফ, যুক্তরাজ্য সরকার, ইউএসএইড, ইসলামিক রিলিফ-ইউকে এবং স্পেন ৩০ মিলিয়িন মার্কিন ডলারের সাহায্যের অঙ্গিকার করেছিলো। ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডাব্লএফপি) দূর্গত মানুষের জন্য ১০,০০০ মেট্রিক টন চাল এবং ২০০ টন উচ্চ প্রোটিন সম্মৃদ্ধ বিস্কুটের অনুমোদন দেয়।

তবে সব ছাপিয়ে আজ এগারো বছর বাদে এসে এখনও মানুষের মনে ঘূর্ণিঝড় সিডরের সেই ভয়াবহতার স্মৃতিটাই বারবার ফিরে ফিরে আসে।

প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন
শেয়ার করুন:
  • 2
    Shares





©সর্বস্বত্ব ২০১৬-২০২০ সংরক্ষিত