আজ ১৫ই অক্টোবর, ২০১৮ ইং; ৩০শে আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ; শরৎকাল

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সমালোচনার সুযোগ নেই: মোস্তাফা জব্বার

  • 8
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    8
    Shares
মোস্তফা জব্বার

জাতীয় ডেস্ক: সংসদে পাস হওয়া ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’কে ঐতিহাসিক বলে আখ্যায়িত করেছেন ডাক, টেলিযোযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি বলেন, ‘এই আইন নিয়ে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সমালোচনা করার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের অভিমতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের কথা অনুসারে যেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন দরকার, তার সবই করা হয়েছে।’ বুধবার (১৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে তিনি এসব কথা বলেন।

এদিকে বিলটির জনমত যাচাইয়ের দাবি তুলে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্যরা বলেন, স্টেক হোল্ডারদের আপত্তি ও বিতর্কিত ধারাগুলো অপরিবর্তিত রেখে আইন পাস হওয়া খুবই উদ্বেগজনক। এতে তাদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ঝুঁকি সৃষ্টি করা হবে।

মোস্তাফা জব্বার তার বক্তব্যে বলেন, ‘২০১৫ সাল থেকে আমরা সব স্তরে এই বিলটি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। সংসদীয় কমিটির রিপোর্ট দেখলে দেখা যাবে, সাংবাদিকদের সঙ্গে কী পরিমাণ আলোচনা করেছি। আইনমন্ত্রী যে কতবার তাদের সঙ্গে বসেছেন, পরামর্শ নিয়েছেন। প্রত্যেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের অভিমতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। সংসদে উত্থাপিত বিল ও সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনের সঙ্গে তুলনা করলে তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিলটি লাইন বাই লাইন সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করেছি। তাদের কথা অনুসারে যেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন দরকার, তার সবই করেছি। সংবাদপত্র দমনের জন্য এই আইন নয়, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণের জন্যও এই আইন নয়। কাগজের পত্রিকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে প্রেস অ্যান্ড পাবলিবেশন্স অ্যাক্ট। সম্প্রচার মিডিয়ার জন্য প্রযোজ্য হবে সম্ভাব্য সম্প্রচার কমিশন আইন। এই আইন কেবল ডিজিটাল অপরাধ দমন করার জন্য। অভিমত প্রকাশ করার ক্ষেত্রে কোনও প্রতিবন্ধকতা যেন না থাকে, সেজন্য তথ্য অধিকার আইনের অধিকার সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষণ করেছি। তাদের বক্তব্য অনুসারে, তারা যেসব বিষয়ে একমত হয়েছেন, সেগুলোসহ যেসব জায়গায় যে ধরনের সংশোধন করা দরকার, আমরা তা করেছি।’

তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী বলেন, ‘সম্পাদক পরিষদের নেতারা সংসদীয় কমিটি ও আইনমন্ত্রীর সঙ্গে যে কথাগুলো বলেছেন, সম্ভবত তা ভুলে গেছেন। না হলে এই বিল সম্পর্কে তাদের সমালোচনার অবস্থান বিরাজ করে না।’ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার উপায়টি এই আইন খুলে দিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

সাংবাদিকরা ৩২ ধারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন উল্লেখ করে মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘সেখানে তারা গুপ্তচরবৃত্তির কথা বলেছিলেন। সংসদীয় কমিটি সেটাকে সংশোধন করে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের কথা বলেছে। এই অফিশিয়াল সিক্রেসটস অ্যাক্টের অপপ্রচারের নজির এখনও নেই।’

ভবিষ্যতে ডিজিটাল যুদ্ধ হবে উল্লেখ করে মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘এই যুদ্ধে যদি রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা দিতে না পারি, রাষ্ট্র যদি বিপন্ন হয়, তাহলে অপরাধটা আমাদেরই হবে। আমরা তা হতে দিতে পারি না। বাক-স্বাধীনতা বা সাংবিধানিক স্বাধীনতা—এসব কথাবার্তা বলে তারা যদি ওইসব পরিস্থিতির জন্য সুযোগ তৈরি করে রাখতে চান, তাহলে দেশ রক্ষা করা সম্ভব হবে না।’ তিনি বলেন, ‘এই আইনটি বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক আইন। আমরা একটি ঐতিহাসিক কাজের সাক্ষী হয়ে সংসদে থাকছি।’

তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী  বলেন, ‘আমাদের আইন প্রণয়নের সময়ে উন্নত দেশগুলো এটি অনুসরণ করার জন্য প্রায় প্রতিটি বৈঠকের পর খোঁজ নিয়েছেন। আমরা কোন ধারায় কী করেছি, তা জানতে চেয়েছে। এই আইন পৃথিবীর বহুদেশকে অনুসরণ করতে হবে। আমরা যেমন করে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার গর্ব করি, তেমন সবার আগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের জন্যও গর্ব করবো। সিঙ্গাপুরের ডিজিটাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইন বিধি-বিধান দেখলে বোঝা যাবে, আমরা এটাকে স্বর্গরাজ্য বানিয়েছি। আর ওটাকে জেলখানা মনে করতে হবে।’

এর আগে বিলের জনমত যাচাই, বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং সাধারণ নীতির ওপর আলোচনার সময় জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমাম বলেন, ‘স্টেক হোল্ডারদের আপত্তি ও বিতর্কিত ধারাগুলো অপরিবর্তিত রেখে সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা খুবই উদ্বেগজনক। একদিকে প্রস্তাবিত বিলের ৮, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারার বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্বেগ ও অভিমতকে উপক্ষো করা হয়েছে, যা তাদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ঝুঁকি সৃষ্টি করা হবে। অন্যদিকে বিতর্কিত ৩২ ধারা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আমলের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট-১৯২৩ অনুসরণের সুপারিশ করার দৃষ্টান্ত অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাব্যঞ্জক।’ তিনি বলেন, ‘নিবর্তনমূলক এই আইন সংযোজনের উদ্দেশ্য বুঝতে পারছিন না। প্রস্তাবিত আইনের ৩২ ধারার অপপ্রয়োগের ফলে তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত আইনি অধিকার ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হবে। ফলে এই ধরনের অপরাধের আরও বিস্তার ঘটবে। এছাড়া অনুসন্ধানীমূলক সাংবাদিকতা ও  যেকোনও ধরনের গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড  পরিচালনা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে। আইনে রূপান্তর হলে তা সংবিধানের মূল চেতনা, বিশেষ করে মুক্তচিন্তা, বাক-স্বাধীনতা, মত-প্রকাশের স্বাধীনতা, গণম্যাধ্যম্যের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করবে। ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে নাগরিকদের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করবে।’

ফখরুল ইমাম বলেন, ‘সরকার ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি কল্যাণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন নিশ্চিতের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, প্রস্তাবিত আইনটি বাধা সৃষ্টি করবে। গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের ভূমিকা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। গণমাধ্যমসহ সব নাগরিকের সব ধরনের ভয়ভীতির ঊর্ধ্ব থেকে সরকারকে সহযোগিতা দেওয়া এবং বাধাহীনভাবে অভিমত প্রকাশ করতে পারে, তার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব করছি।’

বিরোধী দলের সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে অভিমত ও চিন্তার স্বাধীনতার যে  কথা বলা হয়েছে, এই আইন হবে তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’ তিনি বলেন, ‘তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল করা হলেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অনেক জায়গায় ৫৭ ধরার ভীতি আরও বেশিভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে অনেক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার প্রতিকারে কোনও ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এই আইনে সংবাদে কাঁচি চালানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কোনও প্রকার আলোচনা ছাড়াই একজন কর্মকর্তা কোনও সংবাদ ব্লক বা অপসারণ করতে পারবেন। সম্পাদকের উদ্বেগের বিষয়ে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা দেওয়া হলেও আইনে তা প্রতিফলিত হয়নি। এই আইন গণমাধ্যমকে ক্ষুব্ধ করবে। নির্বাচনের আগে সমাজের এ রকম একটি বিশাল প্রগতিশীল অংশকে ক্ষুব্ধ করা ঠিক হবে না।

প্রিন্ট করুন

মন্তব্য করুন